চাণখাঁরপুলে ৬ শহীদ নিহতের ঘটনায় কঠোর দণ্ড; সম্পদ জব্দের আদেশ, অসন্তোষ প্রকাশ করে আপিলের ঘোষণা প্রসিকিউশনের
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চাণখাঁরপুল এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৬ আন্দোলনকারীকে হত্যার দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাবেক এডিসি শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বাকি পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি জুলাই গণহত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায়। এর আগে প্রথম রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে ভিডিও ফুটেজ ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কয়েকজন আসামির কম সাজা হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে চাণখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের মরণঘাতী গুলিতে শাহারিয়ার খান আনাসসহ ৬ জন শহীদ হন। ট্রাইব্যুনাল এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
রায়ের সারসংক্ষেপ ও দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকা
ট্রাইব্যুনাল আসামিদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তিন ভাগে বিভক্ত করে রায় প্রদান করেছেন:
- মৃত্যুদণ্ড (৩ জন): হাবিবুর রহমান (পলাতক), সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (পলাতক) ও শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম (পলাতক)। তারা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
- কারাদণ্ড (৫ জন): সাবেক এসি মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছর, পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে ৪ বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায় পাঠকালে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বাসায় জুলাই অভ্যুত্থানের সময় একটি ‘কোর কমিটি’র বৈঠক হতো। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান সেখান থেকেই ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে মরণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া কনস্টেবল সুজন হোসেনের হাতে লাঠি থাকার কথা থাকলেও এডিসি আখতারুল তাকে জোর করে চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি করতে বাধ্য করেন। ভিডিও চিত্রে গুলি করার পর সুজনের ‘উচ্ছ্বাস’ দেখা গেলেও ট্রাইব্যুনাল তাকে কর্তৃপক্ষের নির্দেশের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে গণ্য করে সাজা কমিয়ে দিয়েছেন।
চাণখাঁরপুলে শহীদ ১৬ বছর বয়সী কিশোর শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আনাস যাওয়ার আগে চিঠিতে লিখেছিলেন, “মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেষ্ঠ।” শহীদ পরিবারগুলো কয়েকজন আসামির ৩-৪ বছরের লঘু সাজার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে ‘অযৌক্তিক’ বলে দাবি করেছেন।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তিনজনের মৃত্যুদণ্ড সঠিক হলেও অন্য পাঁচজনের লঘু সাজা ন্যায়সঙ্গত হয়নি। সাজা বাড়ানোর জন্য প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। অন্যদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আইনজীবীরাও সাজার বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত এই মামলাটি শেষ করতে ট্রাইব্যুনাল সময় নিয়েছে মাত্র ২৮১ দিন। পলাতক চার আসামির সম্পদ জব্দের আদেশ অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
















