উত্তর সাগরে বড় আকারের নতুন বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে যুক্ত হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এই উদ্যোগে নরওয়ে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ আরও নয়টি ইউরোপীয় দেশ অংশ নিচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, এই চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অনিশ্চিত দামের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।
এই প্রথমবারের মতো নতুন কিছু সামুদ্রিক বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র একাধিক দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হবে সমুদ্রতলের বিশেষ বিদ্যুৎ কেবলের মাধ্যমে, যেগুলোকে আন্তঃসংযোগকারী বলা হয়। সমর্থকদের মতে, এতে গোটা অঞ্চলে বিদ্যুতের দাম কমতে পারে।
তবে বিষয়টি বিতর্কের জন্মও দিতে পারে। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদকরা বিভিন্ন দেশের মধ্যে তুলনা করে যেখানে দাম বেশি, সেখানে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। সরবরাহ সংকটের সময় এতে কিছু দেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড সোমবার জার্মানির হামবুর্গ শহরে উত্তর সাগরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা স্বাক্ষর করবেন। লক্ষ্য রাখা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো পরিকল্পনা সম্পন্ন করার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের শিল্পসংস্থা রিনিউএবল ইউকের উপপ্রধান নির্বাহী জেন কুপার বলেছেন, এই উদ্যোগ বিদ্যুৎ বিল কমাতে সাহায্য করবে এবং যুক্তরাজ্যসহ পুরো উত্তর সাগর অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
তবে বিরোধী দলের ছায়া জ্বালানি মন্ত্রী ক্লেয়ার কুটিনহো সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুতগতিতে বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের এই তাড়াহুড়া শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ১০টি সমুদ্রতল কেবল রয়েছে। তবে সরাসরি একাধিক দেশের সঙ্গে বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত করার উদ্যোগ এবারই প্রথম।
জ্বালানি অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আরও বেশি সংযোগ বিদ্যুতের খরচ কমাতে এবং সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় গ্রিড কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জানিয়েছে, এ ধরনের ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত রাখার জন্য যে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, তা কমানো সম্ভব। আলাদা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপের সঙ্গে বিদ্যমান সমুদ্রতল কেবলগুলো ব্যবহারের ফলে যুক্তরাজ্যের ভোক্তারা প্রায় এক দশমিক ছয় বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করেছেন।
তবে নরওয়েতে আন্তঃসংযোগকারী কেবল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেখানে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়লে দেশের ভেতরে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যেতে পারে। এই কারণে নরওয়ে সরকার প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ রপ্তানি সীমিত করার নিয়ম চালু করেছে এবং স্কটল্যান্ডের সঙ্গে নতুন একটি কেবল স্থাপনের অনুমতিও দেয়নি।
এই বৈঠকে ন্যাটো ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার এবং নাশকতার ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়েও আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে বায়ু বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি আবারও স্পষ্ট হলো, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন।
তিন বছর আগে উত্তর সাগর অঞ্চলের দেশগুলো ৩০০ গিগাওয়াট সামুদ্রিক বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। নতুন এই চুক্তির আওতায় এর মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট যৌথভাবে নির্মিত হবে এবং এর মধ্যে ২০ গিগাওয়াট প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বে সামুদ্রিক বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে চীন শীর্ষে রয়েছে। যুক্তরাজ্য দ্বিতীয় অবস্থানে, যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ১৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প চালু আছে। সরকার আরও প্রায় ২০ গিগাওয়াট প্রকল্পের চুক্তি দিয়েছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও মতভেদ রয়েছে। বিরোধী দলগুলো উচ্চ ব্যয়ের সমালোচনা করলেও লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি, এসএনপি ও প্লেইড কামরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।
















