ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি দুই সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রীর দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। নভেম্বরের নির্বাচনের পর চলমান রাজনৈতিক সমঝোতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত কার্যত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির ক্ষমতায় ফেরার পথ সুগম করেছে।
এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু পুরোনো নেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর ইরাকে কার্যকর রাষ্ট্রগঠনে ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আল-মালিকি আবার ক্ষমতায় এলে দেশটি ২০১৪ সালের সেই নীতিগত বিপর্যয়ের দিকে ফিরে যেতে পারে, যার সুযোগ নিয়ে আইএসআইএল উত্থান ঘটিয়েছিল।
২০০৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় আল-মালিকিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন স্থিতিশীলতার স্বার্থে সমর্থন দিয়েছিল। তবে ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সুন্নি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। তবুও সেই সমর্থন অব্যাহত রাখায় শেষ পর্যন্ত ইরাককে যে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে হয়, তা ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
প্রথম দুই মেয়াদে আল-মালিকি এমন এক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। দে-বাথিফিকেশনের নামে তিনি সুন্নি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক করে তোলেন। ২০১০ সালের নির্বাচনের আগে এই আইনের আওতায় নয়টি দল ও চার শতাধিক প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়, যাদের অধিকাংশই ছিলেন সুন্নি।
তার নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা বাহিনী মধ্যপন্থী সুন্নি রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন করে। ২০১৩ সালে কিরকুক প্রদেশের হাওয়িজা শহরে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় অন্তত ৪৪ জন নিহত হন।
এই সময় বাগদাদে সুন্নি জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করে শিয়া অধ্যুষিত এলাকা সম্প্রসারণের অভিযোগও ওঠে। এর ফলে সমাজে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন তীব্র হয় এবং দেশটি গৃহসংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। এই অসন্তোষই পরে আল-কায়েদা ও আইএসআইএলের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।
আল-মালিকির শাসনামলে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মাত্রাও ছিল ব্যাপক। ইরাকি সংসদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর থেকে প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতিতে হারিয়ে যায়, যার বড় অংশ ঘটেছে তার শাসনকালেই। এই অর্থ ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিলাসী জীবনযাপন, ব্যয়বহুল সম্পত্তি কেনা ও গোপন হিসাবেই ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীতেও ব্যাপক অনিয়ম ছিল। কাগুজে সৈন্য দেখিয়ে বেতন তোলার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন ডলার অপচয় হতো। এসব দুর্নীতির ফলেই ২০১৪ সালে আইএসআইএলের অগ্রযাত্রার মুখে ইরাকি সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে।
গত এক দশকে আল-মালিকি রাজনীতির বাইরে থাকলেও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। বরং নেপথ্যে থেকে নিজের প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি শক্ত করেছেন। তৃতীয় মেয়াদে তার ক্ষমতায় ফেরা হলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হবে এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক দিক থেকেও এই প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ার পর ইরাক ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠেছে। আল-মালিকির ক্ষমতায় ফেরা ইরাকের জন্য তেহরান থেকে স্বাধীন নীতি গ্রহণের পথ আরও সংকুচিত করতে পারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক হতে পারে। ওয়াশিংটন চায় ইরানপন্থী আধাসামরিক বাহিনীকে বিলুপ্ত করে সেনাবাহিনীতে একীভূত করতে। তবে আল-মালিকি এসব কাঠামোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়ায় এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল সমস্যা কেবল আল-মালিকির নীতিতে নয়, বরং ইরাকের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সেই একই চক্রে আটকে পড়ায়। ২০১৪ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও দেশটির রাজনৈতিক অভিজাতরা শিক্ষা নেয়নি। কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহির অভাবে ইরাক আবারও অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
















