আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার প্রেক্ষাপটে সমর্থকদের সতর্ক করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। জান্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক বক্তব্য বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড মামলায় সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। ওই মামলায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। জান্তার পক্ষে শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন মন্ত্রীরা কো কো হ্লাইং ও থিদা ও।
এই প্রেক্ষাপটে জান্তা সরকার চার দফা নির্দেশনা জারি করেছে। বিশেষ করে কট্টর জাতীয়তাবাদী সংগঠন বর্ণ ও ধর্ম সুরক্ষা সমিতি ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ে জান্তার পক্ষে সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এই সতর্কতা দেওয়া হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সমর্থকদের কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে জাতিগত বিদ্বেষমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না, উসকানিমূলক প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা যাবে না এবং অবমাননাকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা এর বিচারকদের সমালোচনা কিংবা চাপ সৃষ্টি করা থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনসমক্ষে বক্তব্যে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার বিষয়টি তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কতার মাধ্যমে জান্তা সরকার অতীতে কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রোহিঙ্গাবিরোধী বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। ২০১৭ সালে রাখাইনে সেনা অভিযানের সময় প্রভাবশালী ভিক্ষু ও সাবেক কট্টর সংগঠনের নেতাদের দেওয়া উসকানিমূলক ভাষণ বর্তমানে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে গাম্বিয়ার পক্ষ।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন, রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণাবাক্য গণহত্যার উদ্দেশ্যেরই প্রমাণ। এসব বক্তব্যে জড়িতদের মধ্যে কট্টর ভিক্ষু ও সামরিকপন্থী ব্যক্তিদের নামও উঠে এসেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে যদি এ ধরনের ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রকাশ পায়, তাহলে তা মামলায় মিয়ানমারের বিপক্ষে শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সে কারণেই জান্তা সরকার সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এক আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষক বলেছেন, ঘৃণাবাক্য দমন করতে ব্যর্থ হলে সেটি রাষ্ট্রের নীরব সম্মতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। গাম্বিয়া এই বক্তব্যগুলোকে গণহত্যার মানসিকতা হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাই মানবাধিকার নয়, বরং মামলার ক্ষতির আশঙ্কায় জান্তা এই সতর্কতা দিচ্ছে।
আদালতে জান্তার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ভিক্ষু বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বক্তব্যকে রাষ্ট্রের অবস্থান হিসেবে ধরা যায় না। তাঁদের মতে, কেউ ঘৃণাবাক্য ব্যবহার করলেও তা রাষ্ট্রের গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না।
এর মধ্যেই জান্তা-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলের সমর্থনের খবর প্রচার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো সরকারের প্রতি জনসমর্থনের ছবি তুলে ধরা।
আগামী ২৭ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ে জান্তার পক্ষে সমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সমাবেশ হবে সেনা-সমর্থিত নির্বাচনের ঠিক পরদিন। পাঁচ বছর আগে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আয়োজিত এই নির্বাচনকে অনেকেই সামরিক শাসন পাকাপোক্ত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা শুরু হয় ২০১৬ ও ২০১৭ সালে রাখাইনে সেনা অভিযানের পর। ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যা, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতের অভিযোগ রয়েছে। সে সময় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ ছাড়া রাখাইন অভিযানের সময় সেনাপ্রধান থাকা মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় পৃথক এক আন্তর্জাতিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে।
















