আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নিরসন কমিটি। সংস্থাটি জানিয়েছে, নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ প্রক্রিয়া, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়টি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কমিটি জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসে পাঠানো আগের চিঠির পরও ভারত সরকার এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি, যা দুঃখজনক। ওই আগের চিঠিতে আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।
কমিটি উল্লেখ করেছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধি নিয়ে ভারত সরকারের ব্যাখ্যা তারা নথিভুক্ত করেছে। তবে সেই ব্যাখ্যায় নাগরিকপঞ্জি সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত বৈষম্যের মূল অভিযোগগুলোর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের তুলনামূলকভাবে বেশি বাদ পড়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, পুরোনো নথি সংগ্রহে জটিলতা, যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং অনেককে অস্পষ্টভাবে ‘মূল বাসিন্দা নন’ বলে চিহ্নিত করার মতো বিষয়গুলো এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এই ‘মূল বাসিন্দা নন’ শব্দটির কোনো স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নেই বলেও কমিটি উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদের সময় বিদেশি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা নিজেদের অবস্থান চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাননি। এর ফলে তারা কার্যত নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকার হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব প্রক্রিয়া বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর অসম বোঝা চাপিয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ও বন্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত।
জাতিসংঘের কমিটি আরও জানিয়েছে, আসাম সরকার বিভিন্ন জেলায় বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জোরপূর্বক উচ্ছেদ চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব উচ্ছেদের ক্ষেত্রে বিকল্প বাসস্থান বা ক্ষতিপূরণের যথাযথ ব্যবস্থা করা হয়নি বলেও বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযানকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ বা পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও অধিকারকর্মীদের দাবি, এতে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড লঙ্ঘিত হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ নিয়েও ভারত সরকার কোনো তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে ওই সময় বেসামরিক ব্যক্তি ও সংগঠিত গোষ্ঠীর সহিংস হামলার অভিযোগে এই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার ঝুঁকিতে পড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এতে বারবার হতাহতের ঘটনা ঘটলেও তদন্ত, বিচার বা জবাবদিহি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে কমিটি জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য নিরসন সনদের সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় কমিটি ভারত সরকারকে এসব অভিযোগ মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলেছে। ভারতের পরবর্তী পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের এই সংস্থা।
















