উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে কৃষিতে দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। জমির সংখ্যা কমলেও যে খামারগুলো টিকে আছে, সেগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে—এমনটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে।
কানাডার সাসকাচেওয়ানের তৃতীয় প্রজন্মের কৃষক জেক লেগি এর একটি উদাহরণ। তাঁর দাদা ১৯৫৬ সালে যে খামার শুরু করেছিলেন, সেটি এখন ১৭ হাজার একর জমিতে বিস্তৃত। ক্যানোলা, গম, ফ্ল্যাক্স ও ডালজাতীয় ফসল চাষ হয় সেখানে। ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন, কীভাবে তাঁর বাবা ও দাদা দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাক্টর চালিয়ে বীজ বপন ও ফসলে স্প্রে করতেন। সেই কাজ ছিল কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ।
বর্তমানে প্রযুক্তি সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। আধুনিক সফটওয়্যার ও সেন্সরযুক্ত ট্রাক্টরের মাধ্যমে এখন নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট আগাছা শনাক্ত করে স্প্রে করা যায়। ফলে রাসায়নিকের ব্যবহার কমে, খরচ সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদন বাড়ে। লেগির মতে, এসব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুফল দ্রুত পাওয়া যায়। কখনো কখনো শুধু একটি সহজ অ্যাপ ব্যবহার করেই খামারের হিসাব ও পরিকল্পনা অনেক উন্নত করা সম্ভব।
এই প্রবণতা শুধু বড় খামারে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের সবজি ও পশুপালনভিত্তিক খামারের মালিক নোরা লেক আগে ফসলের হিসাব রাখতে স্প্রেডশিট ব্যবহার করতেন। এখন তিনি বিশেষ সফটওয়্যার ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বীজের পরিমাণ, ফলনের হিসাব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সহজে করতে পারছেন। এতে সময় ও শ্রম দুটোই কমছে।
বিশ্বজুড়ে কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি সমাধানের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহচিত্র ও দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া তথ্য ব্যবহার করে অনেক সফটওয়্যার ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই শনাক্ত এবং আগাম সতর্কতা দিতে পারছে। এতে কৃষকরা আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে পারছেন।
কৃষিবিদদের মতে, এসব প্রযুক্তির প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাছেও পৌঁছাতে পারে। উৎপাদন বাড়লে এবং ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল হবে, যা দাম কমাতেও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তাও আরও নির্ভরযোগ্য হবে।
তবে সব কৃষক সমানভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন না। তুলনামূলকভাবে তরুণ কৃষকেরা নতুন প্রযুক্তিতে আগ্রহী হলেও অনেক প্রবীণ কৃষক পরিবর্তনে অনাগ্রহী। তবুও বাস্তবতা হলো, আজকের বড় খামারগুলো বহু পরিবারের জীবিকা ও কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত। তাই টিকে থাকতে হলে কার্যকর প্রযুক্তিকে গ্রহণ করাই ভবিষ্যতের পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কৃষিকে যদি আধুনিক ব্যবসা হিসেবে দেখা যায়, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর খামারই হতে পারে আগামীর কৃষির মূল ভিত্তি।
















