বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুতর কিন্তু তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত সংকট সামনে আসছে। তা হলো পানির অতিরিক্ত ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিপুল পানির চাহিদা আশপাশের এলাকার স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির শক্তি ব্যবহারের মাত্রা বিপুল এবং এর বড় একটি অংশ নির্ভরশীল পানির ওপর। এই প্রযুক্তি নতুন লেখা, ছবি বা কোড তৈরিতে ব্যবহৃত হলেও এর পেছনের অবকাঠামো চালাতে প্রয়োজন হয় বিশাল শক্তি। প্রতিদিন কোটি কোটি অনুসন্ধান ও ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ব্যবহৃত হয়, যা প্রচুর তাপ তৈরি করে।
এই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তথ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক দিনে কয়েক লাখ গ্যালন সমপরিমাণ পানি শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় খরচ হয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বৈশ্বিক পানির ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
কিছু প্রতিষ্ঠান সমুদ্রের পানি বা পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারের চেষ্টা করলেও বাস্তবে এখনও অধিকাংশ তথ্যকেন্দ্রেই বিশুদ্ধ পানির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। পুনর্ব্যবহার পদ্ধতিও জটিল, কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পানিতে ধুলা ও খনিজ জমে গুণগত মান নষ্ট হয়।
পানির এই সংকট সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। যেসব এলাকায় পানির ঘাটতি আগে থেকেই রয়েছে, সেখানে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানি আরও দুর্লভ হয়ে উঠছে। ফলে মানুষ খাবার ও পান করার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে হাত ধোয়া, গোসল বা বাসস্থান পরিষ্কারের মতো মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে পারছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিরাপদ পানির অভাব ও দুর্বল স্যানিটেশন কলেরা ও ডায়রিয়াসহ নানা সংক্রামক রোগ ছড়ানোর প্রধান কারণ। এসব রোগ শিশুদের ক্ষেত্রে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যদিও এখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্রের সঙ্গে রোগ বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি, তবে ঝুঁকির লক্ষণ স্পষ্ট। স্থানীয় পানির উৎস কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের প্রাণহানির আগেই প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
কিছু অঞ্চলে ইতোমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা পানির রঙ বদলে যাওয়া ও দূষণের অভিযোগ তুলেছেন। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পর কলের পানিতে পলি ও অস্বাভাবিক গন্ধ দেখা যাচ্ছে বলে তারা দাবি করছেন। এসব এলাকার বেশিরভাগই সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চল, যা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি দূষণের ফলে স্বল্পমেয়াদে পেটের রোগ থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জীবাণুজনিত দূষণ তীব্র অসুস্থতা সৃষ্টি করে, আর রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে।
আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে নতুন তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এসব দেশে দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ অনেক সময় অজানাই থেকে যায়।
বিশ্বের মোট পানির মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি। এই সীমিত সম্পদ শুধু তথ্যকেন্দ্র নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিপ তৈরির মতো পুরো প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেই জড়িত। ফলে এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক সংকট।
অনেক প্রতিষ্ঠান পানি ব্যবহারে টেকসই হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, কোথা থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে এবং কারা এর মূল্য দিচ্ছে, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতি অর্থহীন। ধনী এলাকায় পানি ফিরিয়ে দিয়ে দরিদ্র অঞ্চলের মানুষকে সংকটে ফেললে তা সামাজিক দায় পূরণ করে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারগুলোকে দ্রুত আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে কর্পোরেট পানিব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার না দিলে লাগামহীন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের জীবন ও প্রকৃতির জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য এখনই পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
















