অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উদ্ভাবনের প্রভাব এবং নতুন প্রযুক্তি কীভাবে পুরোনো প্রযুক্তিকে প্রতিস্থাপন করে—এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য ২০২৫ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জোয়েল মকির, ফিলিপ এগিওন এবং পিটার হুইট।
তারা ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ বা “creative destruction” নামে পরিচিত ধারণাটিকে আধুনিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা অর্থনৈতিক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের অন্যতম মূল প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত।
নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া জোয়েল মকির (৭৯) যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফিলিপ এগিওন (৬৯) কলেজ দ্য ফ্রান্স এবং লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকসের সঙ্গে যুক্ত, আর কানাডায় জন্ম নেওয়া পিটার হুইট (৭৯) ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।
মকির ইতিহাসনির্ভর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য পরিচিত, যেখানে তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ও উদ্ভাবনের প্রভাব খুঁজে দেখেছেন। অপরদিকে এগিওন ও হুইট গণিতভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ও ধারণা পুরোনোগুলোকে প্রতিস্থাপন করে প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করে।
পুরস্কার ঘোষণার পর মকির জানান, “এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে এমন কিছু ঘটতে পারে।” তিনি হাস্যরস করে বলেন, “আমি আমার ছাত্রদের বলেছিলাম, অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়ার চেয়ে পোপ নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা আমার বেশি—আর আমি তো ইহুদি।”
ফিলিপ এগিওন বলেন, “আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। এই সম্মান আমার গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করবে।” তিনি জানান, পুরস্কারের অর্থ গবেষণাগারে বিনিয়োগ করবেন।
অর্থনৈতিক বিশ্বে সৃজনশীল ধ্বংসের ধারণাটি প্রথম জনপ্রিয় করেন অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পিটার, যিনি ১৯৪২ সালে প্রকাশিত Capitalism, Socialism and Democracy গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে নতুন উদ্ভাবন পুরোনো শিল্প ও প্রযুক্তিকে ধ্বংস করে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন প্রবৃদ্ধির পথও খুলে দেয়।
নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, “মকির দেখিয়েছেন, টেকসই উদ্ভাবনের জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, তার পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও জ্ঞানভিত্তিক কাঠামোও অপরিহার্য।”
এগিওন ও হুইট ১৯৯২ সালের একটি গবেষণায় সৃজনশীল ধ্বংসের ওপর গাণিতিক মডেল তৈরি করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে ধারাবাহিক উদ্ভাবন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
এগিওন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ২০১৭ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালে তিনি ফরাসি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে একটি প্রতিবেদনে ২৫টি সুপারিশ দেন, যার লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সকে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় অগ্রগামী করা।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার বলেন, “তাদের কাজ প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনও স্থায়ীভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। আমাদের এমন প্রক্রিয়াগুলো বজায় রাখতে হবে, যা উদ্ভাবন ও সৃজনশীল ধ্বংসকে এগিয়ে নিয়ে যায়, নইলে আমরা স্থবিরতায় পড়ে যাব।”
পুরস্কারের ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) অর্থমূল্যের অর্ধেক পাবেন মকির, বাকি অর্ধেক ভাগ করে নেবেন এগিওন ও হুইট।
ব্যাংক অব সুইডেন ১৯৬৮ সালে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনীতিতে এই বিশেষ পুরস্কার প্রবর্তন করে। যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেলের মূল পাঁচটি পুরস্কারের মধ্যে নয়, প্রতি বছর ডিসেম্বরের ১০ তারিখ, নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে অন্যান্য পুরস্কারের সঙ্গে একসঙ্গেই এটি প্রদান করা হয়।

















