শীত মৌসুমে যখন বরফে ঢাকা থাকার কথা, তখন হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অংশে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে ন্যাড়া ও পাথুরে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে হিমালয় অঞ্চলে শীতকালীন তুষারপাত গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে যে সামান্য তুষারপাত হচ্ছে, সেটিও দ্রুত গলে যাচ্ছে। নিচু এলাকাগুলোতে বরফের বদলে বৃষ্টিপাত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি প্রভাব বলে জানিয়েছে আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, হিমালয়ের বহু অঞ্চলে এখন শীতকালে ‘স্নো ড্রাউট’ বা তুষারখরা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলন একটি বড় সংকট। শীতকালে তুষারপাত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এতে শুধু পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ বদলাচ্ছে না, বরং এই অঞ্চলের শত শত কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
শীতকালে জমে থাকা বরফ বসন্তে গলে নদ-নদীতে পানি জোগান দেয়। এই বরফগলা পানিই পানীয় জল, সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উৎস। কিন্তু তুষারপাত কমে যাওয়ায় পানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। পাশাপাশি শুষ্ক পরিস্থিতির কারণে বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বরফ ও তুষার পাহাড়কে এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘বন্ধন’ হিসেবে ধরে রাখে। সেগুলো কমে গেলে পাহাড় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভূমিধস, শিলাপাত, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা ও ধ্বংসাত্মক ধসের ঘটনা বাড়ছে, যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে উত্তর ভারতের প্রায় সব এলাকায় বৃষ্টি ও তুষারপাত ছিল না বললেই চলে। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অংশে গড়ের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ কম বৃষ্টি ও তুষারপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাত ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের হিসাবে প্রায় ১৮৪ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৮০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিম ও মধ্য হিমালয়ের বড় অংশে শীতকালীন বৃষ্টি ও তুষারপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে গত পাঁচ বছরে তুষারপাত প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে।
নেপালেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে অক্টোবরের পর থেকে প্রায় কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি এবং টানা পাঁচ বছর ধরেই শীতকাল তুলনামূলকভাবে শুষ্ক যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আবহাওয়াবিদরা। যদিও কিছু বছরে হঠাৎ ভারী তুষারপাত হয়েছে, তবে সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও চরম ঘটনা, আগের মতো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়া তুষারপাত নয়।
বিজ্ঞানীরা তুষারপাত কমার আরেকটি সূচক হিসেবে ‘স্নো পারসিস্টেন্স’ বা কতদিন বরফ জমে থাকে তা বিশ্লেষণ করছেন। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ শীত মৌসুমে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে তুষার স্থায়িত্ব ২৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ নিচে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের প্রধান নদীগুলোর বার্ষিক পানিপ্রবাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে বরফগলা পানি থেকে। ফলে তুষারপাত ও বরফ জমে থাকার সময় কমে গেলে প্রায় দুইশ কোটি মানুষের পানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বেশিরভাগ বিজ্ঞানী শীতকালীন বৃষ্টি ও তুষারপাত কমে যাওয়ার জন্য পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ বা ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্ব্যান্স দুর্বল হয়ে পড়াকে দায়ী করছেন। অতীতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা এই নিম্নচাপগুলো শীতকালে উত্তর ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও তুষারপাত ঘটাত। এখন সেগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং কিছুটা উত্তরের দিকে সরে যাওয়ায় আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালীন বৃষ্টি ও তুষারপাত হ্রাসের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে গবেষণা চললেও একটি বিষয় স্পষ্ট—হিমালয় এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে দ্রুত হিমবাহ গলন, অন্যদিকে তুষারপাতের ঘাটতি। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব ভবিষ্যতে অঞ্চলটির পরিবেশ, পানি সম্পদ ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।















