শেখ হাসিনার অবস্থান ও ‘ফেলানী অ্যাভিনিউ’ নিয়ে অস্বস্তি; নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় ভারত
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত ১৫ বছরের ‘ঘনিষ্ঠতা’ ছাপিয়ে এখন দুই দেশের মধ্যে বিরাজ করছে নজিরবিহীন তিক্ততা ও অবিশ্বাস। সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ চেষ্টা, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ভারতে আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ এবং দিল্লির গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার এই দূরত্বকে আরও উসকে দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা ক্ষীণ; কারণ ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কেবল একটি ‘নির্বাচিত’ সরকারের সঙ্গেই পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
গত চার মাস ধরে সীমান্তে উত্তেজনা এবং দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাল্টাপাল্টি তলব করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে।
অস্থিরতার কেন্দ্রে শেখ হাসিনা ও অপরাধী প্রত্যর্পণ
দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন জানালেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘাতকদের ভারতে আশ্রয়ের খবর ঢাকার রাজপথে তীব্র ভারতবিরোধী বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
প্ররোচনামূলক মন্তব্য ও কূটনৈতিক সংঘাত
- সেভেন সিস্টার্স বিতর্ক: এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ‘সেভেন সিস্টার্স’ সংক্রান্ত মন্তব্যকে ভারত অত্যন্ত ‘প্ররোচনামূলক’ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। এর জবাবে ভারতের পক্ষ থেকেও কড়া কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়েছে।
- ফেলানী অ্যাভিনিউ: বিজয় দিবসে ঢাকার একটি সড়কের নাম বিএসএফের হাতে নিহত কিশোরী ‘ফেলানী খাতুন’-এর নামে নামকরণ করায় ভারত নাখোশ হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার একে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেখছে।
- ভিসা সেবা স্থগিত: আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের মিশনে হামলা এবং চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশই সাময়িকভাবে ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করেছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ: নতুন সমীকরণ?
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঝটিকা ঢাকা সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক না করে সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বেশি আগ্রহী।
ক্রিকেট ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রভাব
কূটনৈতিক দূরত্বের প্রভাব এখন খেলার মাঠেও দৃশ্যমান। আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানকে নেওয়ার পর বাদ দেওয়া এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের দাবি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের একতরফা প্রচারণা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ভারতের কড়া সমালোচনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: নির্বাচনের অপেক্ষা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এই সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের সুযোগ কম। ভারত বর্তমানে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and Watch) নীতি অনুসরণ করছে। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরই কেবল দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের নতুন রোডম্যাপ তৈরি হতে পারে।















