২০২৩ সালের নববর্ষের আগের রাতে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমে জীবন বদলে যায় যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের বাসিন্দা ড্যান রিচার্ডসের। ল্যাংল্যান্ড বে সৈকতে একটি ঢেউয়ের আঘাতে উল্টে গিয়ে বালিতে সজোরে আছড়ে পড়েন তিনি। সেই দুর্ঘটনাতেই মারাত্মকভাবে ঘাড়ে আঘাত পান ৩৭ বছর বয়সী ড্যান, যার ফল ছিল শরীরের বড় অংশে পক্ষাঘাত।
ড্যান জানান, ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি উল্টে গিয়ে পেছনের দিকে ভেঙে পড়েন এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেন আর নড়াচড়া করতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা তখন জানিয়েছিলেন, তিনি সারা জীবন শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে পারেন। তবে দুর্ঘটনার দুই বছর পর এখন তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে পারেন এবং হাত ও আঙুল নড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
সবচেয়ে আশার বিষয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি আবার হাঁটার অভিজ্ঞতাও পেয়েছেন। ওয়েলস ও জার্মানির বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ড্যান কিছু সময়ের জন্য হলেও হাঁটতে পেরেছেন।
দুর্ঘটনার সময় ড্যানের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সঙ্গী আনা থমাস। নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে দুজনেই ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন। আনা জানান, ড্যানের সাহায্যের চিৎকার শুনে তিনি দৌড়ে আসেন এবং অন্যদের সহায়তায় তাঁকে পানি থেকে তুলতে সক্ষম হন। তবে দ্রুত উঠতে থাকা ঢেউয়ের মধ্যে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
ব্রিস্টলের হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, ড্যান ঘাড় থেকে নিচে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ভবিষ্যতে আর হাঁটা বা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নতুন সম্পর্কের শুরুতেই এমন খবর পরিবারকে জানানো আনার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন।
দুর্ঘটনার পর প্রতিটি দিন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে বলে জানান আনা। তবে হাসপাতালে থাকার সময় ড্যানের পায়ের আঙুলে সামান্য অনুভূতি ফিরে আসা তাঁদের নতুন করে আশা দেখায়। ধীরে ধীরে পা ও পায়ের পাতায় অনুভূতি, ডান পায়ে কিছু নড়াচড়া, এমনকি শরীরের মধ্যভাগের শক্তিও ফিরতে শুরু করে।
ড্যান বলেন, তিনি সহজে হার মানতে রাজি নন। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভরসা রেখেছেন। দক্ষিণ ওয়েলসের নিউপোর্টে একটি বিশেষায়িত ক্লিনিকে তিনি রোবট ও সেন্সরযুক্ত স্যুটের মাধ্যমে হাঁটার প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রযুক্তিতে রোবট মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার ভঙ্গি অনুকরণ করে এবং সেন্সরযুক্ত পোশাক পেশিতে সঠিক সময়ে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেয়, যা ধীরে ধীরে হাঁটার ধরন তৈরি করতে সহায়তা করে।
এই অভিজ্ঞতাকে ড্যান ‘অবিশ্বাস্য’ ও ‘জীবনের সেরা অনুভূতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এই ধরনের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় পরিবার ও বন্ধুরা তহবিল সংগ্রহে এগিয়ে আসেন।
গত অক্টোবরে ড্যান ও আনা জার্মানির বোখুম শহরে যান, যেখানে একসঙ্গে দুটি ভিন্ন চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে। এর একটি হলো স্টেম সেল চিকিৎসা, যা সরাসরি মেরুদণ্ডে প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যটি হলো হাইব্রিড অ্যাসিস্টিভ লিম্ব স্যুট, যা মস্তিষ্কের সংকেত পড়ে তা পায়ের নড়াচড়ায় রূপান্তর করে।
ড্যান জানান, যত বেশি এই চিকিৎসা নেওয়া হয়, ততই স্নায়ুর সংকেত শক্তিশালী হয় এবং ভবিষ্যতে যন্ত্র ছাড়াই হাঁটার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। নতুন বছরে জার্মানিতে আরও কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর, যদিও এর জন্য আলাদা মেডিকেল ভিসার প্রয়োজন হবে।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও ড্যান আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তি দ্রুত এগোচ্ছে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন গবেষণা সীমাহীন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তিনি বলেন, এখন যতটা অগ্রগতি করা যাবে, ভবিষ্যৎ ততটাই ভালো হবে।
















