পিপিআরসি জরিপে এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যের মধ্যে; বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবৃদ্ধির মুনাফা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি
বিশেষ প্রতিবেদন | ডেল্টা আউট লুক
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার আবারও বেড়ে গেছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)–এর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রতি চারজনের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষ এখন দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় এই হার অনেক বেশি, যা দেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নধারার সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল শুধু দারিদ্র্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত নয়, বরং আগের অর্জনের ভঙ্গুরতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আগের তথ্য কি অতিমাত্রায় আশাবাদী ছিল?
বিবিএস ২০২২ সালের যে তথ্য প্রকাশ করেছিল, তাতে দারিদ্র্যের হার ছিল মাত্র ১৮.৭ শতাংশ। কিন্তু সেই জরিপটি পরিচালিত হয়েছিল ২০২১ সালে, যখন কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনমিক মডেলিং (সানেম), ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পিপিআরসি নিজস্ব জরিপে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পেয়েছিল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি জরিপে বাস্তব চিত্র কম দেখানো হয়েছিল, ফলে দেশের দারিদ্র্য হ্রাসের গল্পটি ছিল তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে,
- ২০২৫ সালের মে মাসে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮%
- ২০২২ সালের সরকারি হিসাবে (বিবিএস জরিপ) হার ছিল ১৮.৭%
- বর্তমানে দেশের ১৮% পরিবার যেকোনো দুর্যোগে সহজেই দারিদ্র্যের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে
- চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬% (২০২২) থেকে বেড়ে ৯.৩৫% (২০২৫) হয়েছে
প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু কর্মসংস্থান নেই
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে “জবলেস গ্রোথ” বা কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি ছিল। অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু এর সুফল কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়নি।
কর্মসংস্থানের চিত্র
- কর্মজীবীর ৩৮% আসলে পূর্ণ সময় কাজ করছেন না (ছদ্মবেকার)
- নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ: মাত্র ২৬%
- প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী স্বনিয়োজিত → আয় অনিশ্চিত
অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে “দারিদ্র্য হ্রাসের নিম্ন ইলাস্টিসিটি” বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ, জিডিপি বাড়লেও দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব খুব সীমিত। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসের পথে বড় বাধা।
পোশাক খাতের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সবচেয়ে গতিশীল খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। কয়েক বিলিয়ন ডলারের এই রপ্তানি শিল্পের শ্রমিকরা মাসে মাত্র ১২,৫০০ টাকা (প্রায় ১১৩ ডলার) মজুরি পান যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়নি। ফলে নিম্ন মজুরি ও অনিশ্চয়তার চক্র অব্যাহত রয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির বিনিয়োগের প্রভাব
২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোভিড পরবর্তী প্রভাব, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে পড়ে। এ সময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে।
যদিও চলতি বছরে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমেছে, তা এখনও উচ্চমাত্রায় রয়েছে। পিপিআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, এখন শহুরে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ শুধুই খাবারের পেছনে যায়। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সঞ্চয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না।
“দারিদ্র্য শুধু আয়ের ঘাটতি নয়”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দারিদ্র্য এখন শুধু আয়ের ঘাটতি নয়, বরং একটি “নাজুক জীবনধারা”। একবার অসুস্থতা বা জরুরি ব্যয় এলেই পরিবারগুলো দারিদ্র্যের নিচে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেহেতু বিশ্বের অন্যতম উচ্চ ‘আউট-অফ-পকেট’ স্বাস্থ্য ব্যয় বিদ্যমান, তাই এই ঝুঁকি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

শহর (২০২৫):
আয়: ৪০,৫৭৮ টাকা
ব্যয়: ৪৪,৯৬১ টাকা
শহর (২০২২):
আয়: ৪৫,৫৭৮ টাকা
গ্রাম (২০২৫):
আয়: ২৯,২০৫ টাকা
ব্যয়: ২৭,১৬২ টাকা
জাতীয় গড় আয়: ৩২,৬৮৫ টাকা
জাতীয় গড় ব্যয়: ৩২,৬১৫ টাকা
মাসিক গড় সঞ্চয়: ৭০ টাকা
আয় বৈষম্য
- নিচের ১০% পরিবারের আয়: ৮,৪৭৭ টাকা
- উপরের ১০% পরিবারের আয়: ১,০৯,৩৯০ টাকা
রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন যেমন রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ম্যাক্রো-ইকোনমিক উন্নতি যেন বাস্তব জীবনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা না হয়।
“আনুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স বাড়লেও পরিবারের হাতে প্রকৃত অর্থ কতটা পৌঁছাচ্ছে এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন,”
বলেন এক অর্থনীতিবিদ।
পাঁচ নতুন ঝুঁকি
- দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা (৫১% পরিবারে অন্তত একজন আক্রান্ত)
- নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবার (৪ পরিবারের মধ্যে ১টি)
- ঋণনির্ভর জীবনযাপন (বিশেষ করে খাবার কেনায়)
- ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা (অনেকে মাসে অন্তত এক দিন না খেয়ে থাকেন)
- স্যানিটেশন সংকট (৩৬% মানুষ নন-স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করেন)
টিকে থাকার চার প্রত্যয়
- প্রবাসী আয়
- ২১,১০০ কোটি টাকার স্থানীয় ভোক্তা বাজার
- ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি অভ্যস্ততা
- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভোক্তার মানিয়ে নেওয়া ক্ষমতা
যখন পরিবারের আয় কমে, কিন্তু খাদ্যের দাম বাড়ে
পিপিআরসি’র তথ্য বলছে, শহুরে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের ৫৫ শতাংশ এখন কেবল খাদ্যের পেছনে যায়। এতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সঞ্চয়ের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলো প্রায় উপেক্ষিত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উচ্চ স্ব-ব্যয়ভিত্তিক স্বাস্থ্যখরচের দেশ—যেখানে যে কোনো স্বাস্থ্যসংকট পরিবারকে মুহূর্তে দরিদ্র করে দিতে পারে।

তরুণ প্রজন্মের হতাশা
সানেম-এর মে ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। তারা বলছেন, শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে পৌঁছানোর পথে এক ধরনের “ভাঙা সেতু” তৈরি হয়েছে একদিকে যোগ্যতা অর্জন, অন্যদিকে চাকরির সুযোগের অভাব।
তাদের অভিযোগ, দুর্নীতি, অকার্যকর নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠান কাঠামোই মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত, কোনো সরকারই কি এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো সংশোধনের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য পুনরাবৃত্তির গল্পের মূল শিক্ষা হলো
“যে প্রবৃদ্ধি মানুষের অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে পারে না, তা টেকসই নয়।”
তারা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে কতটা স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা আনছে, সেটাই আসল পরিমাপক।














