ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির জন্ম দিয়েছে। জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের লাগাতার দরপতনের প্রতিবাদে রোববার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। পরিস্থিতির কোনো তাৎক্ষণিক উন্নতির লক্ষণ না থাকায় সোমবারও একই এলাকায় আরও মানুষের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তেহরানের জমহুরি এলাকায় অবস্থিত দুটি বড় প্রযুক্তি ও মোবাইল ফোন মার্কেটের আশপাশের দোকানিরা রোববার দোকান বন্ধ রেখে স্লোগান দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একই এলাকার পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি মহল্লায়ও লোকজন জড়ো হয়। বিক্ষোভকারীরা একে অপরকে সাহস জুগিয়ে বলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সবাই একসঙ্গে আছি।
বিক্ষোভ দমনে রাস্তায় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। বিভিন্ন ভিডিওতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে দেখা গেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকাতেও অনেক দোকান মালিক দোকান বন্ধ করে দেন এবং অন্যদেরও একই পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিক্ষোভের বিষয়টি স্বীকার করলেও দ্রুতই তা সীমিত করে উপস্থাপন করে। তাদের ভাষ্য, দোকানিরা কেবল অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতিতে উদ্বিগ্ন, দেশের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের কোনো রাজনৈতিক আপত্তি নেই। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা রিয়ালের লাগামহীন দরপতনে ক্ষতির মুখে পড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
সোমবার রিয়ালের দর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এক ডলারের বিনিময়ে প্রায় ১৪ লাখ ২০ হাজার রিয়াল ছুঁয়ে যায়, পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সংকট কাটেনি।
মুদ্রা সংকটের পাশাপাশি ইরান দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ও পানি সংকটে ভুগছে। শক্তি সংকটের কারণে পর্যায়ক্রমে ভয়াবহ বায়ুদূষণ তৈরি হচ্ছে, যা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে পানি সরবরাহকারী বেশিরভাগ বাঁধ প্রায় খালি অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ইন্টারনেট ব্যবস্থাও বিশ্বের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ ব্যবস্থাগুলোর একটি।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকার এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপের কারণে। চলতি বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইরানে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক, শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানীরাও ছিলেন। ওই হামলায় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে থাকা ইরানের বেশিরভাগ পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। এরপর থেকে ওই সব স্থাপনায় আইএইএর প্রবেশও বন্ধ রয়েছে।
এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন, ২০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তখনও কর্তৃপক্ষ বিদেশি প্ররোচনা ও অস্থিতিশীলতার অভিযোগ তোলে।
এদিকে রোববার সংসদে বিতর্কিত বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে মজুরি ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হলেও মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে ৬২ শতাংশ।
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে পেজেশকিয়ান বলেন, একদিকে বলা হচ্ছে কর বেশি নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বলা হচ্ছে বেতন বাড়াতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই অর্থ আসবে কোথা থেকে।
















