প্রথমবারের মতো ভারতে জন্মহার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে এসেছে। সর্বশেষ সরকারি জনমিতি জরিপ অনুযায়ী, দেশটির মোট প্রজনন হার এখন প্রতি নারীর ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৯ শিশু, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর নিচে।
গত দুই দশকে ভারতে জন্মহার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। দুই হাজার সালের শুরুর দিকে যেখানে প্রতি নারীর গড়ে ৩ দশমিক ৩টি সন্তান জন্ম হতো, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের শিক্ষার প্রসার, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের ভূমিকা বৃদ্ধি এবং সন্তান লালন-পালনের ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়াও জন্মহার হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগে সন্তান বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তার কারণে পরিবারগুলো বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী ছিল। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে সেই প্রবণতা কমেছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মহারের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও কম শিক্ষিত রাজ্যগুলোতে জন্মহার এখনও বেশি। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধাসম্পন্ন রাজ্যগুলোতে জন্মহার অনেক নিচে নেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে আগামী কয়েক দশকে ভারতের কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। এতে শ্রমবাজার, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে ভারত এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। এই পরিস্থিতিকে জনমিতিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জন্মহার কমে যাওয়ার প্রভাব রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। বিভিন্ন রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে পার্থক্যের কারণে ভবিষ্যতে সংসদীয় আসন বণ্টন এবং কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে কয়েকটি রাজ্য ইতোমধ্যে বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। কোথাও তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তানের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সন্তান ধারণে সহায়তামূলক চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়ার বাস্তবতায় সরকারের উচিত ভবিষ্যতের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করা। কারণ আগামী দশকগুলোতে ভারতের সবচেয়ে বড় জনমিতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে দ্রুত বর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী।
















