ঢাকার উপকণ্ঠে জনসমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বললেন, দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য তাঁর একটি পরিকল্পনা আছে। এই উচ্চারণ শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের শেষে দেশে ফেরা এক রাজনীতিকের আত্মপ্রকাশ।
বৃহস্পতিবার লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে তাঁকে বরণ করে নিতে জড়ো হন লাখো নেতাকর্মী ও সমর্থক। দীর্ঘ সময় পর তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে যেমন নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে, তেমনি দেশের অস্থির রাজনীতিতেও এনে দিয়েছে ভিন্ন এক বার্তা।
সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ নানা ভূগোল ও নানা বিশ্বাসের মানুষের দেশ। পাহাড় ও সমতলের মানুষ, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সবাই যেন নিরাপদে বাঁচতে পারে, ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ফিরতে পারে, সেই বাংলাদেশ গড়াই তাঁর লক্ষ্য। কথাগুলো উচ্চারিত হয় এমন এক সময়ে, যখন সহিংসতা, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে আসন্ন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠুভাবে হবে কি না।
সম্প্রতি এক তরুণ রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ডের পর দেশে সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় শীর্ষ দুটি জাতীয় দৈনিকের কার্যালয়, আর একটি নৃশংস ঘটনায় প্রাণ হারান এক সংখ্যালঘু ব্যক্তি। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, নির্বাচন হয়তো অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, ঠিক এই মুহূর্তে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং নির্বাচনকে সঠিক পথে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান মনে করেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এতে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, তা অনেকটাই কাটতে পারে এবং দেশ একধরনের স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রত্যাবর্তনের পর তারেক রহমান আদৌ শক্ত নেতৃত্ব দিতে পারবেন কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তিনি চরমপন্থার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন, মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগ বোঝার আশ্বাস দেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুতির প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে। অন্যথায়, স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুবারশার হাসানের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে যে জনউচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তা শুধু বিএনপির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। গত ১৬ মাসে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগের মধ্যে বিএনপিকে অনেকেই একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
তারেক রহমানের এই ফিরে আসা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিরও প্রকাশ। একই সঙ্গে সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, অতীতে তাঁর সঙ্গে অবিচার করা হয়েছিল। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয় এবং পরে অনুপস্থিতিতেই দণ্ড দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেসব মামলা প্রত্যাহার ও দণ্ড স্থগিত হওয়ায় তাঁর দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, তারেক রহমান নীতিনির্ভর রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সমাবেশে তিনি বারবার পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন হবে, সেদিকে নজর রাখছে গোটা দক্ষিণ এশিয়া।
ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ছিল শীতল। আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের স্পষ্ট ঝোঁক এবং বিএনপির জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং নিজেকে মধ্যপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, বিএনপি সেখানে অবস্থান নিতে চায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগান দিলেও তিনি কট্টর ভারতবিরোধী রাজনীতিতে যাবেন না। বরং ভারতের জন্য তিনি এমন একজন শক্তিশালী ও বাস্তববাদী আলোচক হয়ে উঠতে পারেন, যাঁর সঙ্গে কার্যকর সংলাপ সম্ভব।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের দৌড়ে বিএনপি ও জামায়াত কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, আর বড় একটি অংশের ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁর উপস্থিতি দলের কর্মীদের উজ্জীবিত করবে এবং অনিশ্চিত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে।
তবে সবকিছুর মূল চাবিকাঠি তাঁর নেতৃত্বের ধরন। মানুষকে কতটা কাছে টানতে পারেন, কতটা আশ্বস্ত করতে পারেন এবং সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য কতটা স্পষ্ট পথনকশা দিতে পারেন—সেটাই নির্ধারণ করবে এই প্রত্যাবর্তন কেবল আবেগের জোয়ারে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
















