ব্যক্তিগত শোক, স্মৃতি আর দাবার নীরব পাঠ নিয়ে এক অনুভবের গল্প তুলে ধরেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক বিদ্যা কৃষ্ণন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে, কীভাবে দাবার বোর্ড জীবনের ক্ষতি, বিচ্ছেদ আর না-বলা কথাগুলোর অর্থ বুঝতে সহায়তা করেছে।
ভারতের গোয়ায় এক নভেম্বর বিকেলে দাবার বোর্ডে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখেন লেখক। স্বাগতিক ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টার অর্জুন এরিগাইসি মুখোমুখি হন চীনের ওয়েই ইয়ের। দর্শকে ভরা হলে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা নিঃশব্দে খেলা দেখছিল। খেলা শুরু হয় একটি সাধারণ চাল দিয়ে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। সময়ের চাপে একটি বড় ভুলের পর ধীরে ধীরে খেলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এরিগাইসির। সেই ভাঙন লেখকের কাছে হয়ে ওঠে এক ধরনের নাটকীয় অভিজ্ঞতা।
লেখকের কাছে দাবা কেবল একটি খেলা নয়, বরং শৈশব থেকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনুভূতি। তাঁর জীবনে দাবার আগমন ঘটে মামার হাত ধরে। অর্থকষ্ট আর অস্থির জীবনের মাঝেও সেই মানুষটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন দাবার বোর্ড। ছোট বয়সে একটি ভাঙা প্লাস্টিকের ঘোড়া হাতে নিয়ে মামা বলেছিলেন, ঘোড়াই তাঁর প্রিয় ঘুঁটি, ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে তা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সেই মুহূর্তেই লেখকের মনে দাবার প্রতি এক গভীর আকর্ষণ জন্ম নেয়।
শৈশবে খেলায় হার মানতে না চাওয়া, রাগ করা, এমনকি দাবা ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। জীবনের অন্য টানে ধীরে ধীরে মামা ও দাবা—দুজনের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হয়। পরে যখন লেখক আবার দাবার কাছে ফেরেন, তখন মামা আর বেঁচে নেই। তাঁর মৃত্যুর পর দাবার বোর্ডই হয়ে ওঠে সেই একমাত্র জায়গা, যেখানে তিনি এখনও মামার কাছাকাছি থাকতে পারেন।
মহামারির সময় দাবা ছিল লেখকের আশ্রয়। খেলতে খেলতে তিনি উপলব্ধি করেন, দাবায় যেমন প্রতিটি খেলোয়াড়ের নিজস্ব ধরন থাকে, তেমনি মানুষের জীবনেও থাকে আলাদা পথ। কারও কাছে বিশেষ কোনো ঘুঁটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারও কাছে বিশেষ কোনো পরিস্থিতি। লেখকের জন্য সেই ধারণার নাম ‘জুগজুয়াং’—দাবার এমন এক অবস্থা, যেখানে খেলোয়াড়কে চাল দিতেই হয়, কিন্তু যে চালই দেওয়া হোক, তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
এই জুগজুয়াং-এর মধ্যেই তিনি খুঁজে পান নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। শৈশবে মামার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক থাকলেও বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মতের অমিল, দূরত্ব আর না-বলা কথা জমতে থাকে। কোনো একক বিচ্ছেদ নয়, বরং ধীরে ধীরে সম্পর্কটি এসে দাঁড়ায় এমন এক জায়গায়, যেখানে কিছু করার ছিল না। মামার মৃত্যুর সময় লেখক অনুভব করেন, তাঁরা দুজনই যেন জীবনের এক মানসিক জুগজুয়াং-এ আটকে পড়েছিলেন।
মৃত্যুর পর শোক হঠাৎ আঘাত হয়ে আসেনি, বরং ধীরে ধীরে জমেছে। লেখক আফসোস করেন, তিনি কখনও মামাকে বলতে পারেননি যে ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা আসলে তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া। সেই ছোট পছন্দটি টিকে গেছে, সম্পর্কের কথোপকথন হারিয়ে গেলেও।
দাবার বিখ্যাত কিছু খেলায় জুগজুয়াং বিশ্লেষণ করতে করতে লেখক বুঝতে শেখেন, সব পরাজয়ের শেষ হয় নাটকীয়ভাবে নয়। কখনও কখনও পরিণতি আসে নীরবে, অনিবার্যভাবে। তাঁর কাছে শোকও তেমনই—কোনো চূড়ান্ত মুহূর্ত নয়, বরং ধীরে ধীরে উপলব্ধি।
আজও জুগজুয়াং তাঁকে নতুন অর্থ শেখায়। গভীর এন্ডগেমে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই কষ্টের, দাবার বোর্ড হয়ে ওঠে আয়নার মতো। সেখানে তিনি এখনও দেখতে পান শৈশবের সেই ভাঙা প্লাস্টিকের ঘোড়াটি, যা একসময় তাঁকে জীবনের প্রথম কৌশল আর ক্ষতির পাঠ শিখিয়েছিল।
















