বর্ণবৈষম্য দূর করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে ছয় দশক আগে। কিন্তু সেই চেষ্টার বহু বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য আজও গভীরভাবে বিদ্যমান। জাতিসংঘে গৃহীত বর্ণবৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ৬০ বছর পূর্তিতে এই বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে।
সাধারণভাবে মানবাধিকার ইতিহাসে পশ্চিমা দেশগুলোকেই অগ্রণী হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে বাস্তবে বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর। ১৯৬৩ সালে উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নয়টি সদ্য স্বাধীন আফ্রিকান দেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বর্ণবৈষম্য নির্মূলের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের প্রস্তাব তোলে। তাদের যুক্তি ছিল, উপনিবেশিক অঞ্চল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য তখনো বাস্তবতা, আর বিশ্বকে এই লড়াইয়ে একত্রিত করার সময় এসে গেছে।
এর দুই বছর পর, ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে ‘সব ধরনের বর্ণবৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ গ্রহণ করে। এতে বর্ণভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের যেকোনো মতবাদকে বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, নৈতিকভাবে নিন্দনীয় এবং সামাজিকভাবে অন্যায় ঘোষণা করা হয়।
তবে কনভেনশন গৃহীত হওয়ার ছয় দশক পরও বাস্তবতা বদলায়নি। আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পুলিশি সহিংসতা, বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি, শ্রমক্ষেত্রে শোষণ ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। ব্রাজিলে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে দরিদ্র আফ্রো-ব্রাজিলিয়ানদের বড় একটি অংশ নিহত হয়েছেন। তিউনিসিয়ায় অভিবাসন নীতির নামে কৃষ্ণাঙ্গ শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের অভিযোগ উঠেছে। সৌদি আরবে কেনিয়ার নারী গৃহকর্মীরা বর্ণবাদী আচরণ ও কঠোর শোষণের শিকার হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি বাতিলের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের অভিযান, গণআটক ও বহিষ্কার নীতিকে অনেকেই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। আটককেন্দ্রগুলোতে নির্যাতন ও অবহেলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
ডিজিটাল যুগে বর্ণবাদ নতুন রূপ নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদী ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানোর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও নীতির কারণে এসব ঘৃণামূলক বয়ান সহিংসতার পথও তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বর্ণবৈষম্যের শিকড় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও তার সঙ্গে যুক্ত বর্ণবাদী মতাদর্শে প্রোথিত। কয়েক শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত সেই ইতিহাস আদিবাসী নিধন, দাসপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
এ অবস্থায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আবারও বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে মামলা, উপনিবেশবাদের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি এবং উপনিবেশবাদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ তার উদাহরণ। ক্যারিবীয় ও আফ্রিকান দেশগুলো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উপনিবেশিক অতীতের দায় স্বীকার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে।
তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এগুলো যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রগুলোকে বর্ণবৈষম্যকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে মানুষ এখনো বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে। ব্রাজিলে আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান নারীদের মিছিল, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানের বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদ তার প্রমাণ। এসব আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে, ছয় দশক আগের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও নিজ নিজ আইনের আওতায় প্রান্তিক ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে বর্ণবৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়বদ্ধতা বাস্তবে কার্যকর করে।
















