যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের আকাশে এখনও ধোঁয়া, ভাঙা ভবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সৈনিকের নিঃশ্বাসে জমে আছে অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তার মাঝেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানাল, তারা ইউক্রেনকে ছেড়ে যাবে না। রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে আগামী দুই বছর ইউক্রেনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে সুদমুক্ত প্রায় ১০৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে ইউরোপীয় নেতারা।
শুক্রবার ভোরে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তা জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য মোট ৯০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে। এই অর্থ জোগাড় করা হবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটকে জামানত হিসেবে রেখে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দীর্ঘ আলোচনার পর নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জব্দ করে রাখা রুশ সম্পদ আপাতত ব্যবহার করা হবে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি কিয়েভের প্রতিরোধশক্তিকে বাস্তব অর্থেই শক্তিশালী করবে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, এই সহায়তা আমাদের টিকে থাকার সাহস বাড়ায়। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন, রাশিয়ার সম্পদ যেন স্থির অবস্থায়ই থাকে এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
এই চুক্তির পেছনে ছিল দীর্ঘ রাতের আলোচনা, আইনি জটিলতা আর রাজনৈতিক টানাপোড়েন। শুরুতে ইউরোপের ভেতরে জোর বিতর্ক চলছিল, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জব্দ সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনকে ঋণ দেওয়া হবে কি না। কিন্তু বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ে পড়তে হতে পারে। কারণ ইউরোপে জব্দ হওয়া প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরোর মধ্যে ১৮৫ বিলিয়ন ইউরোই রয়েছে বেলজিয়ামে।
শেষ পর্যন্ত সেই ঝুঁকি এড়াতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তোলার পথ বেছে নেয়া হয়। কূটনীতিকদের ভাষায়, এই সিদ্ধান্তে আপাতত বিভাজন এড়ানো গেছে। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার বলেন, এতে ইউরোপ বিশৃঙ্খলা আর বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের আর্থিক দায় থাকবে না বলে জানানো হয়েছে, কারণ তারা ইউক্রেনের অর্থায়নে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিল। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্যে রুশ সম্পদের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আলাদা ঋণ কাঠামো গড়ার আলোচনা চলবে।
মস্কোর প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ মন্তব্য করেন, এই সিদ্ধান্তে আইন আর বাস্তববুদ্ধির জয় হয়েছে। তিনি দাবি করেন, রুশ সম্পদ ব্যবহার না করার মাধ্যমে ইউরোপ তথাকথিত যুদ্ধপন্থীদের চাপ থেকে সরে এসেছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ইউক্রেন কেবল তখনই এই ঋণ পরিশোধ করবে, যখন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মস্কোর কাছ থেকে অর্থ পাবে। ততদিন রুশ সম্পদ জব্দ অবস্থায়ই থাকবে, আর প্রয়োজনে ইউরোপ সেই সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধের অধিকারও সংরক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের ভেতরের বিভক্ত বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। একদিকে ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখার দায়, অন্যদিকে আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির ভয়। জার্মান চ্যান্সেলর আগেই সতর্ক করেছিলেন, সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। শেষ পর্যন্ত সেই সমঝোতা এল, কিন্তু ভিন্ন পথে।
ধ্বংসস্তূপের শহর কস্তিয়ানতিনিভকায় দাঁড়িয়ে থাকা এক ইউক্রেনীয় সৈনিকের মতোই, এই ঋণচুক্তি হয়তো ইউক্রেনের জন্য আরেকটি শ্বাস নেওয়ার সুযোগ। যুদ্ধ থামেনি, ক্ষত শুকায়নি। তবু ইউরোপের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনকে জানিয়ে দিল, অন্ধকারের মধ্যেও কেউ কেউ আলো জ্বালিয়ে রাখে।
















