সুদানের আকাশে আবারও নেমে এলো বারুদের অন্ধকার। কর্দোফান অঞ্চলের অবরুদ্ধ শহর ডিলিংয়ে কামানের গর্জনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন নিরস্ত্র মানুষ। দুই দিন ধরে চলা এই গোলাবর্ষণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের রক্তে ভিজেছে বসতবাড়ির উঠোন, আর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের তৃতীয় বছরে পা দেওয়া দেশটি আরও গভীরভাবে ডুবে গেল শোক আর অনিশ্চয়তায়।
চিকিৎসকদের সংগঠন সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস এবং তাদের মিত্র এসপিএলএম-নর্থ দক্ষিণ কর্দোফানের ডিলিং শহরের আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। এই হামলাকে তারা সরাসরি বেসামরিক মানুষের ওপর আঘাত বলে নিন্দা জানিয়েছে।
ডিলিংয়ের এই রক্তপাত শুধু একটি শহরের গল্প নয়। ডিসেম্বরের শুরু থেকে কর্দোফানের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে একশ’। যুদ্ধের মঞ্চ ধীরে ধীরে পশ্চিম দারফুর থেকে সরে এসে দেশের কৌশলগত কেন্দ্রভাগে পৌঁছেছে, যেখানে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে।
এই গোলাবর্ষণ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ডিলিংয়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগে থেকেই ভেঙে পড়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে অবরোধে থাকা শহরটি কলেরা আর ডেঙ্গুর মতো রোগের সঙ্গে লড়ছে, আর এখন কামানের আঘাতে সেই ক্ষত আরও গভীর হলো।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে কর্দোফানের তিনটি রাজ্য থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। শুধু ডিলিং শহর থেকেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় সাতশ’ মানুষ। তারা আশ্রয় নিয়েছে পাশের এলাকাগুলোতে, প্রায় শূন্য হাতে, চোখে দেখা বিভীষিকার স্মৃতি বয়ে নিয়ে। জাতিসংঘের শরণার্থী কর্মকর্তারা এই অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করেছেন ‘অকথ্য ভয়াবহতা’ হিসেবে।
এই সহিংসতা নতুন নয়, কিন্তু ভয়াবহতার মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছিলেন, কর্দোফানে ইতিহাস যেন আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে। দারফুরের এল-ফাশেরে ঘটে যাওয়া গণহত্যার স্মৃতি এখনো তাজা, যাকে জাতিসংঘ একসময় ‘অপরাধস্থল’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
এরই মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ কর্দোফানের রাজধানী কাদুগলিতে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এই হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সেখানে জাতিসংঘ মিশন তাদের লজিস্টিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। চলতি বছরের এপ্রিলে দারফুরের জামজাম শরণার্থী শিবিরে তিন দিনের অভিযানে আরএসএফ এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পরিকল্পিতভাবে যৌন সহিংসতাকে আতঙ্ক ছড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, আর শিবিরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে, বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে, এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। জাতিসংঘ এই সংকটকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করছে।
এই রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটে সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান সম্প্রতি কায়রো সফর করেছেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে গ্রহণ করেন। মিসর সতর্ক করেছে, প্রতিবেশী সুদানে তাদের ঘোষিত ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না, বিশেষ করে দেশের অখণ্ডতা ও সমান্তরাল সরকারের প্রশ্নে।
কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে মানবিক যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একই সঙ্গে আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে, যা আবুধাবি অস্বীকার করে আসছে।
কর্দোফানের ধুলোয় আজ শুধু ধ্বংস নয়, জমে আছে প্রশ্ন। এই যুদ্ধ আর কত প্রাণ নেবে, আর কত মায়ের চোখে অশ্রু জমালে বিশ্ব সত্যিই থামার ডাক দেবে?
















