ডিসেম্বরের শীতল সন্ধ্যায় মরক্কোর আকাশজুড়ে যখন আলো জ্বলবে, তখনই শুরু হবে আফ্রিকান ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় উৎসব। রোববার পর্দা উঠছে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ২০২৫-এর, যেখানে মহাদেশের সেরা দল আর উজ্জ্বল তারকারা একত্র হয়ে লিখবে আবেগ, লড়াই আর গৌরবের নতুন অধ্যায়।
২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়ন আইভরি কোস্ট শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন দেখছে। তবে স্বাগতিক মরক্কো, সাতবারের চ্যাম্পিয়ন মিসর, শক্তিশালী সেনেগাল ও নাইজেরিয়ার মতো দলগুলোও তাকিয়ে আছে ইতিহাস গড়ার দিকে। মোহাম্মদ সালাহ, আশরাফ হাকিমি, ভিক্টর ওসিমহেনদের উপস্থিতিতে এবারের আসর শুধু মাঠের লড়াই নয়, গল্পেরও এক বিশাল মঞ্চ।
এই টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে ডিসেম্বর ২১ থেকে, গ্রুপ পর্ব চলবে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত। এরপর জানুয়ারির শুরুতে নকআউট পর্ব, আর সব উত্তেজনার পরিসমাপ্তি হবে ১৮ জানুয়ারি। ওই দিন রাবাতের প্রিন্স মৌলাই আবদেল্লাহ স্টেডিয়ামে, প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে নির্ধারিত হবে আফ্রিকার নতুন রাজা।
জুনে হওয়ার কথা থাকলেও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের কারণে সূচি বদলে শীতকালে আয়োজন করা হয়েছে এবারের আসর। ফলে এই প্রথম বড়দিন আর নতুন বছরের আবহে বসছে আফ্রিকার ফুটবল মহাযজ্ঞ।
৩৫তম আসরের আয়োজক মরক্কো ইতিহাসে দ্বিতীয়বার এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। দেশটির ছয় শহরের নয়টি স্টেডিয়ামে হবে ম্যাচগুলো। কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, মারাকেশ, আগাদির, ফেজ ও তানজিয়ারের স্টেডিয়ামগুলোতে ফুটবলের ঢেউ আছড়ে পড়বে। বিশেষ করে মরক্কোর সমর্থকদের রঙিন উন্মাদনা আর আগুনঝরা গ্যালারি এই আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে।
এবার অংশ নিচ্ছে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের ২৪টি দল। ছয়টি গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা খেলবে গ্রুপ পর্ব। প্রতিটি গ্রুপ থেকে সেরা দুই দল এবং সেরা চার তৃতীয় দল যাবে শেষ ষোলোয়। এরপর কোয়ার্টারফাইনাল, সেমিফাইনাল আর ফাইনালের পথে হাঁটবে দলগুলো। নকআউট ম্যাচ ড্র হলে বাড়তি সময় ও প্রয়োজনে টাইব্রেকারেই নিষ্পত্তি হবে ভাগ্য।
মরক্কো, মালি, জাম্বিয়া ও কোমোরোস এক গ্রুপে। মিসরের সঙ্গে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা, অ্যাঙ্গোলা ও জিম্বাবুয়ে। নাইজেরিয়া পেয়েছে তিউনিসিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়াকে। সেনেগাল খেলবে ডিআর কঙ্গো, বেনিন ও বতসোয়ানার বিপক্ষে। আলজেরিয়ার গ্রুপে রয়েছে বুরকিনা ফাসো, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও সুদান। আর আইভরি কোস্ট লড়বে ক্যামেরুন, গ্যাবন ও মোজাম্বিকের সঙ্গে।
ফিফার সিদ্ধান্তে খেলোয়াড় ছাড়তে দেরি হওয়ায় অনেক দলই পুরো প্রস্তুতির সময় পায়নি। এই নিয়ে ক্ষোভও ঝরেছে কোচদের কণ্ঠে। তবু আফ্রিকার ফুটবলের গতি থামে না, প্রতিকূলতার মাঝেই সে পথ খুঁজে নেয়।
এখন পর্যন্ত সাতবার শিরোপা জিতে সবচেয়ে সফল দল মিসর। ক্যামেরুনের আছে পাঁচটি, ঘানার চারটি। নাইজেরিয়া ও আইভরি কোস্ট তিনবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ১৯৫৭ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১৫টি দেশ শিরোপার স্বাদ পেয়েছে।
আফ্রিকা কাপ অব নেশনস কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি গর্ব, ইতিহাস আর পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। এই আসরেই ফুটবলের ভাষায় কথা বলে একটি মহাদেশ। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তি জানান দেয় আফ্রিকা। মরক্কোর জন্য এবারের আসর আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০৩০ বিশ্বকাপের আগে এটি এক বড় প্রস্তুতির মঞ্চ।
শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে আছে স্বাগতিক মরক্কো ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আইভরি কোস্ট। টানা জয়ের রেকর্ড গড়া মরক্কো ঘরের মাঠে খেলবে বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে। আইভরি কোস্টও সাম্প্রতিক সাফল্যে উজ্জ্বল। সালাহর মিসর, সেনেগাল, তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়াও যে কোনো মুহূর্তে চমক দেখাতে পারে।
চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৭ মিলিয়ন ডলার, রানার্সআপ ৪ মিলিয়ন ডলার। মোট প্রাইজমানি ৩২ মিলিয়ন ডলার। টিকিট বিক্রি শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক আগ্রহ। বিশ্বের শতাধিক দেশের দর্শক ইতোমধ্যে টিকিট কিনেছেন। টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সম্প্রচার হবে ম্যাচগুলো।
মরক্কোর আকাশের নিচে এবার ফুটবলের সঙ্গে মিশবে আবেগ, স্বপ্ন আর ইতিহাস। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ২০২৫ যেন এক মহাদেশের হৃদস্পন্দন, যা ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বকে শোনাবে আফ্রিকার গল্প।
















