আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা ঘাসের মাঠে। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, বলের গতি, এমনকি ম্যাচের ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে এই ঘাসের মান।
তাই এবারের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে গত আট বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মাঠের ঘাস নিয়ে চালিয়েছেন বিস্তৃত গবেষণা। তারা বলের গতি মেপেছেন, খেলোয়াড়দের বুটের চাপ পরীক্ষা করেছেন, ঘাসের দৈর্ঘ্য মিলিমিটার ধরে নির্ধারণ করেছেন এবং বিভিন্ন আবহাওয়ার জন্য আলাদা ঘাসের প্রজাতি তৈরি করেছেন।
দুই হাজার চব্বিশ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ও কানাডার ম্যাচে মাঠের ঘাস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। খেলোয়াড়রা অভিযোগ করেছিলেন, বল অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছিল এবং মাঠের মান ছিল খুবই খারাপ।
বিশ্বকাপের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এবার সেই ভুল এড়াতে বিশেষজ্ঞদের একটি দল নিয়োগ দেয়। এই প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন সোরোচান ও মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রে রজার্স।
বিশ্বকাপের জন্য তারা ১৭০টিরও বেশি আলাদা পরীক্ষা চালিয়েছেন। ছোট আকারের গবেষণাগারে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে বল ছুড়ে মাঠের প্রতিক্রিয়া মাপা হয়েছে। স্টিলের তৈরি যন্ত্র দিয়ে ফুটবল বুটের চাপ প্রয়োগ করে পরীক্ষা করা হয়েছে মাঠের স্থিতিস্থাপকতা।
বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত ঘাস তৈরি করা। মিয়ামি ও মেক্সিকো সিটির গরম আবহাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বারমুডা ঘাস। অন্যদিকে টরন্টো ও বোস্টনের মতো শীতল অঞ্চলে ব্যবহার করা হয়েছে কেনটাকি ব্লুগ্রাস ও রাইগ্রাসের মিশ্রণ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, মাত্র পাঁচ মিলিমিটার ঘাসের পার্থক্যই মাঠের গতি বদলে দিতে পারে। তাই প্রতিটি স্টেডিয়ামের জন্য আলাদা উচ্চতায় ঘাস কাটা হবে।
বিশ্বকাপের কয়েকটি স্টেডিয়াম সম্পূর্ণ ছাদযুক্ত হওয়ায় সেখানে সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছায় না। এজন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করছেন বিশেষ এলইডি গ্রো লাইট। এই আলো মাঠের ঘাসকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাবে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
ঘাসের মান ঠিক রাখতে গবেষকেরা সার, সামুদ্রিক শৈবাল, সিলিকা ও বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করেছেন। মাঠের ঘাস কাটার সময়ও বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় যাতে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বিশ্বকাপের জন্য কয়েক লাখ বর্গফুট ঘাস বিশেষ রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে করে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্টেডিয়ামে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি মাঠ ম্যাচের মাত্র ১০ দিন আগে স্থাপন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খারাপ মাঠ শুধু খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি খেলোয়াড়দের গুরুতর চোটের কারণও হতে পারে। তাই এবারের বিশ্বকাপের মাঠকে প্রায় নিখুঁত করার লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে শুধু বিশ্বকাপ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলাধুলার মাঠ উন্নত করতেও কাজে লাগবে।
















