যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে সমুদ্রে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এই পরীক্ষা চালানো হলো। পিয়ংইয়ং নিয়মিতই দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়াকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করে আসছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলের ওনসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি সাত শ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে কোরীয় উপদ্বীপ ও জাপানের মধ্যবর্তী সমুদ্র এলাকায় গিয়ে পড়ে।
জাপানের কর্তৃপক্ষও উৎক্ষেপণটি শনাক্ত করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে গিয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠক করে উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
মাত্র ছয় দিন আগেও একই এলাকা থেকে উত্তর কোরিয়া আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ওই উৎক্ষেপণ শনাক্ত করলেও উত্তর কোরিয়া তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকার করেনি।
সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণের বিষয়ে উত্তর কোরিয়া এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার আসন্ন সামরিক মহড়ার আগে শক্তির প্রদর্শন এবং সতর্কবার্তা দেওয়াই এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে আক্রমণের মহড়া হিসেবে দেখে আসছে। বিপরীতে ওয়াশিংটন ও সিউল বলে আসছে, এসব মহড়া প্রতিরক্ষামূলক এবং সম্ভাব্য উত্তর কোরীয় হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ।
আগামী ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট কোরীয় উপদ্বীপ ও এর আশপাশে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে দুই দেশের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা এবং দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার সদস্যরা অংশ নেবেন।
দুই দেশের দাবি, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার কারণে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। এবারের মহড়ায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার বাড়তে থাকা সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এটি উত্তর কোরিয়ার সন্দেহভাজন একাদশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। গবেষকদের মতে, এসব পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ। একই সঙ্গে কখন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, সেটিও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা একদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ জানানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর পিয়ংইয়ং তার ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র কর্মসূচি আরও জোরদার করেছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলো সেই বৃহত্তর অস্ত্র উন্নয়ন কার্যক্রমেরই অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতাও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার জন্য উত্তর কোরিয়া বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সৈন্যরা সেখানে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নিন্দা জানিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতার জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সিউল।
















