অ্যামাজনের সবুজ হৃদয়ে, ব্রাজিলের বেলেম শহরে শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০। সোমবার উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল অংশগ্রহণকারী ১৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে অনুরোধ করেন— “আপনাদের কাজ একে অপরের বিরুদ্ধে নয়, বরং এই পৃথিবীর বিরুদ্ধে চলা জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে একসাথে লড়াই করা।”
দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে ব্রাজিল, যেখানে প্রথম দিনেই গঠিত হয়েছে আলোচনা সূচি নিয়ে চুক্তি। উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন ট্যাক্সের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনায় আনার চেষ্টা করলেও ব্রাজিল তা সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে গেছে।
তবে, সম্মেলনের শেষে কোনো চূড়ান্ত বৈশ্বিক চুক্তি হবে কিনা তা এখনও অনিশ্চিত। রাজনৈতিক বিভাজন, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানির রূপান্তর বাধাগ্রস্ত করার অবস্থান, পুরো আলোচনাকে কঠিন করে তুলেছে।
জাতিসংঘের নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশগুলোর নির্গমন হ্রাস পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ২০১৯ সালের তুলনায় ১২ শতাংশ কমতে পারে— যা পূর্বের ১০ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে যা প্রয়োজন, সেই ৬০ শতাংশ হ্রাস থেকে এই অগ্রগতি এখনো অনেক দূরে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, “যারা জলবায়ুর বিপদকে অস্বীকার করে, তারা বিজ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয় আর সত্যকে আঘাত করছে। সময় এসেছে, সেই অস্বীকারবাদীদের পরাজিত করার।”
তবে বিশ্বের সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এই সম্মেলনে অংশ নেয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘ভুয়া ধারণা’ বলে দাবি করে এর গুরুত্ব অস্বীকার করেছেন।
এই অনুপস্থিতিতে কড়া সমালোচনা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম। সাও পাওলোতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা ব্রাজিলে আছি— আমাদের বড় বাণিজ্য অংশীদার, গণতান্ত্রিক দেশ, আর বিরল খনিজের ভাণ্ডার। এমন একটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করার বদলে আমরা শুল্কের দেয়াল তুলছি, এটা লজ্জাজনক।”
কপ-৩০–এর সভাপতি আন্দ্রে কোরেয়া দো লাগো সাংবাদিকদের জানান, “যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি আসলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্বকে উজ্জ্বল করে তুলেছে।”
জার্মানির উপমন্ত্রী জোয়াচেন ফ্লাসবার্থ বলেন, ইউরোপ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসের বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে চায়। “আমরা ট্রাম্পের মতো অন্যদের দোষারোপ করতে চাই না। আমরা শুনতে চাই, সহযোগিতা করতে চাই।”
এদিকে, আন্দেস পর্বতমালা পেরিয়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌযাত্রা শেষে বেলেমে পৌঁছেছেন শতাধিক আদিবাসী নেতা। তারা দাবি তুলেছেন, তাদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় যেন তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেরুর আদিবাসী নেতা পাবলো ইনুমা ফ্লোরেস বলেন, “প্রতিশ্রুতির সময় শেষ, এখন সুরক্ষার সময়। কারণ এই জলবায়ু পরিবর্তনের বোঝা আমাদের ঘাড়েই সবচেয়ে বেশি।”
বিশ্বের বিজ্ঞানীরাও কপ-৩০–এ এক সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছেন— হিমবাহ, বরফস্তর ও পৃথিবীর শীতল অঞ্চলগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এক যৌথ চিঠিতে তারা লিখেছেন, “বিশ্বের রাজনীতি কিংবা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ যেন কপ-৩০–এর আলোচনাকে আচ্ছন্ন না করে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট।”
অ্যামাজনের বৃষ্টি, নদী আর বৃক্ষরাজি যেন এই আহ্বানের সাক্ষী— মানুষ যদি একে অপরের নয়, বরং পৃথিবীর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো এখনও সময় আছে ফিরে আসার পথে।
















