ইরানের দাবি, চলমান সংঘাতে দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এসব হামলা শুধু সামরিক নয়, বরং জাতীয় পরিচয় ও জ্ঞানভিত্তিক কাঠামোর ওপর আঘাত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে আসছে, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। তবে ইরানের সরকারি তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৬টি ঐতিহ্যবাহী স্থান, ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫৫টি গ্রন্থাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী রেজা সালেহি আমিরি বলেন, এসব হামলা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের পরিচয় ধ্বংসের উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে। তার মতে, এটি কেবল অবকাঠামোর ক্ষতি নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিক্ষার্থী নিহত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমের তদন্তে এই হামলাকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে গবেষণা কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোমা হামলায় অবকাঠামোগত বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। শাহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হোসেইন সিমাই সারাফ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে হামলা মানে দেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রাকে পেছনে ঠেলে দেওয়া। তার ভাষায়, এটি দেশকে অন্ধকার যুগে ফেরানোর শামিল।
এছাড়া রাজধানী তেহরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে, যেখানে সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা এবং টিকা উৎপাদনের কাজ চলত।
গ্রন্থাগার খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত ৫৫টি গ্রন্থাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদ, গ্র্যান্ড বাজারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ইসফাহানের ঐতিহাসিক মসজিদ ও প্রাসাদেও আঘাত লেগেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা শুধু স্থাপত্য নয়, বরং শতাব্দীর ইতিহাস বহন করে। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করে ইরান বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থানের অবস্থান জানা থাকার পরও সেগুলো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে দেশটির পুনর্গঠন ক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হতে পারে। তবে তারা মনে করেন, দীর্ঘ ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি সভ্যতাকে শুধু হামলার মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
এর আগে ইরাক ও গাজাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের সময় বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
















