কিউবা বর্তমানে সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বেড়ে চলেছে, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ বড় ভূমিকা রাখছে।
দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জানুয়ারি থেকে কার্যত জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ফলে সারাদেশে বারবার বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, কোথাও কোথাও দিনে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচার সীমিত করা হয়েছে, গণপরিবহন প্রায় বন্ধ, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত এবং অনেক মানুষ রান্নার জন্য কাঠ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, এই পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ায় শিশুমৃত্যুর হার বাড়ছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কিউবার রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
কিউবায় প্রেসিডেন্ট থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা এককভাবে তার হাতে নয়। দেশটি একদলীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্র। সংবিধান অনুযায়ী, এই দলই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার প্রধান শক্তি।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের আসল ক্ষমতা আরও গভীরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে সাবেক নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর পরিবার, তার ভাই রাউল কাস্ত্রো এবং সামরিক নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ধরে রেখেছে।
এ কারণে দিয়াজ-কানেলকে সরিয়ে দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে জাতীয় পরিষদ নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কাঠামোগতভাবে সম্ভব।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় কিউবার ওপর চাপ বাড়ছে এবং কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই চাপের অংশ হিসেবেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কয়েকটি নাম আলোচনায় রয়েছে। কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ সামনে আসতে পারেন, আবার দলীয় কাঠামোর ভেতর থেকেও নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যেই আসুক, সামরিক ও দলীয় প্রভাবের বাইরে গিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে দিয়াজ-কানেলের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ২০২১ সালের বিক্ষোভ দমনের ঘটনা তার সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমানে কিউবা এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য—সব মিলিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন সম্ভব হলেও তা কাঠামোগত পরিবর্তনের সমান নয়। বরং এটি হতে পারে ক্ষমতার শীর্ষ স্তরে সীমিত সমন্বয়, যা মূল ব্যবস্থাকে অক্ষত রাখবে।
এই অবস্থায় কিউবার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং চলমান সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর।
















