বাংলাদেশে ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফেটামিনজাত মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুই হাজার পঁচিশ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চার কোটিরও বেশি ইয়াবা ও অনুরূপ মাদক ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে গাঁজাও দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদকের তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, যশোর, কুষ্টিয়াসহ পঁচিশটি জেলাকে মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, উখিয়া ও উপকূলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো ইয়াবা পাচারের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে ইয়াবার উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ইয়াবাকে অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে, ফলে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মাদকের প্রবাহও বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তের ওপারে অভিযান চালানোর সুযোগ সীমিত থাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়াবার মূল উৎপাদনকেন্দ্র মিয়ানমারের শান রাজ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে অবৈধ মাদক কারখানার সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে চিন রাজ্যও মাদক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে রাখাইন হয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিদ্যমান পাচার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করছে। এরপর বিভিন্ন রুটে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে এসব মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি জোরদার হওয়ায় বর্তমানে সমুদ্রপথ ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা ও কুয়াকাটার উপকূল দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে ঢুকছে। এসব পথ ব্যবহার করে শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য দেশেও মাদক পাচার হচ্ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকেও ইয়াবা সংরক্ষণ ও পাচারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শিশুদেরও মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার অঞ্চলের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অতীতে ইয়াবা পাচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত এগোয়নি।
সরকারি হিসাবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা আশি লাখের বেশি। ইয়াবার বিস্তারের সঙ্গে সহিংস অপরাধ, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্পর্কও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজধানীতে সাম্প্রতিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার পাশাপাশি বিদেশি পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এবং সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের কারণে বাংলাদেশের জন্য মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্তে অভিযান ও নজরদারি জোরদার হলেও উৎসস্থলে সংকট অব্যাহত থাকায় অদূর ভবিষ্যতে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
















