যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পর যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশলকে আমূল বদলে দিতে পারে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে—এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় স্থিতিশীলতার প্রচলিত মডেল বড় চাপে পড়বে।
ইরানের পাল্টা হামলায় সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। লক্ষ্যবস্তু হয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর, বন্দর ও বাণিজ্যিক এলাকা। অথচ এসব দেশ সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো কয়েকটি অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—যুক্তরাষ্ট্র প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা, ইরানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে থাকবে এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সমন্বয় আঞ্চলিক রাজনীতিকে ভেঙে পড়তে দেবে না। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এই তিন ভিত্তিকেই একযোগে নাড়িয়ে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় কূটনীতি আরও সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি–ইরান সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, আমিরাতের তেহরানের সঙ্গে বাস্তববাদী যোগাযোগ এবং ওমানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা—সবই ইঙ্গিত দেয় যে সংলাপই স্থিতিশীলতার পথ। কাতারও উত্তেজনা প্রশমনে কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ভারসাম্য নীতিতে চাপ বাড়বে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জোরালো হতে পারে। অভ্যন্তরীণ জনমতও জানতে চাইবে—রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কোথায়। এমন পরিবেশে কৌশলগত অস্পষ্টতা আর নমনীয়তা নয়, বরং দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ঝুঁকি বড়। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। সামান্য বিঘ্নও তেলের দাম, বীমা ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। স্বল্পমেয়াদে উচ্চ তেলের দাম রাজস্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা বিনিয়োগ ও বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো জ্বালানি নির্ভরতা নিয়ে বড় ভোক্তা দেশগুলোর পুনর্বিবেচনা। যদি অঞ্চলকে বারবার অস্থির মনে হয়, তবে তারা বিকল্প উৎসে দ্রুত ঝুঁকতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ভেতরেও দ্বিমত স্পষ্ট হতে পারে। ওমান ও কাতার ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যস্থতা ও সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়। সৌদি আরব ও আমিরাত প্রতিরোধমূলক কৌশলে ঝোঁক দেখালেও সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা কমানোর পথে ছিল। কুয়েত সাধারণত ভারসাম্য রক্ষা করে। সংকট এই পার্থক্যগুলোকে সামনে আনতে পারে, আবার উল্টোভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পথও খুলে দিতে পারে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। চীন ও রাশিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থে চীন কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়াতে পারে। রাশিয়া অস্ত্র বিক্রি ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে পারে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে গভীরভাবে জড়ায় কিন্তু রাজনৈতিক মনোযোগ সীমিত থাকে, তবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে, অন্যদিকে অতিনির্ভরতা এড়াতে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্পও বিস্তৃত করবে। এতে ‘শর্তসাপেক্ষ সমন্বয়’-এর নতুন ধারা তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে কৌশলগত সংস্কৃতিতে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতা, আধুনিকায়ন ও সতর্ক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেই মডেলকে ব্যাহত করে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে কঠিন সমঝোতা চাপিয়ে দিতে পারে।
এ মুহূর্তে উপসাগরীয় অঞ্চল এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তারা কি বৃহৎ শক্তির সংঘাতের সামনের সারিতে পরিণত হবে, নাকি নিজেদের কূটনৈতিক পুঁজি ব্যবহার করে উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করবে—সেই সিদ্ধান্তই আগামী বহু বছর, এমনকি দশকজুড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।
















