যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা ইসরায়েল ও কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা অবস্থান করা ২৭টি ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও জরুরি আলোচনায় বসেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও বৈঠক হয়েছে।
ইরান
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান খামেনির হত্যাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘খোলামেলা যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি একে ইসলামী বিশ্বের জন্য বড় পরীক্ষা বলে অভিহিত করেন এবং জাতীয় শোক ঘোষণা করেন।
ইসরায়েল
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হামলাকে ন্যায়সঙ্গত বলে দাবি করেন। তার ভাষায়, ইসরায়েল ধ্বংসের পরিকল্পনা যিনি করেছিলেন, তিনি নিজেই ধ্বংস হয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল পূর্ণ শক্তিতে অভিযান চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে খামেনিকে ‘ইতিহাসের অন্যতম দুষ্ট ব্যক্তি’ আখ্যা দেন এবং ইরানকে আরও পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরান কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত।
রাশিয়া
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির হত্যাকে ‘নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করেন এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তিনি শোকবার্তায় খামেনিকে রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
চীন
বেইজিং এই হত্যাকাণ্ডকে ইরানের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাস খামেনির মৃত্যুকে ইরানের ইতিহাসে এক নির্ধারক মুহূর্ত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জরুরি।
যুক্তরাজ্য
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। তিনি ইরানের নির্বিচার হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
হামাস
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস এই হামলাকে ‘ঘৃণ্য’ আখ্যা দিয়ে শোক প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পূর্ণ দায়ী করে এবং মুসলিম দেশগুলোকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তুরস্ক
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
ইয়েমেনের হুথি নেতৃত্ব
তারা এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়েছে।
উত্তর কোরিয়া
পিয়ংইয়ং হামলাকে অবৈধ আগ্রাসন বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে।
পাকিস্তান
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শোক প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান ইরানের জনগণের পাশে রয়েছে। তিনি একটি রাষ্ট্রের নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় উদ্বেগ জানান।
ভারত
দেশটির প্রধান বিরোধী দল যৌথ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
চাদ
প্রেসিডেন্ট মহামাত ইদ্রিস দেবে ইটনো ইরানের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং এই কঠিন সময়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।
মালয়েশিয়া
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়াগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, খামেনির হত্যাকাণ্ড শুধু একটি দেশের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন সবার নজর—উত্তেজনা কি আরও বাড়বে, নাকি কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
















