দামেস্কের আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া কিছুটা হালকা হলেও সিরিয়ার হৃদয়ে এখনো থামেনি অস্থিরতার ঢেউ। ভূমধ্যসাগর ঘেঁষা শহরগুলোতে নতুন করে জ্বলে উঠেছে বিক্ষোভের আগুন, যার সূচনা এক মসজিদে ভয়াবহ হামলার মধ্য দিয়ে। নিহতের আর্তনাদ আর ক্ষুব্ধ মানুষের স্লোগানে আবার কেঁপে উঠেছে লাতাকিয়া, বানিয়াস ও তারতুস।
শুক্রবার হোমস শহরের ওয়াদি আল দাহাব এলাকায় জুমার নামাজ চলাকালে আলাওয়ি সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণ হয়। এতে অন্তত আটজন প্রাণ হারান। সেই রক্তের দাগ শুকানোর আগেই রোববার উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে আসে বিক্ষোভ। আলাওয়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ রাস্তায় নেমে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার আর রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি তোলে।
লাতাকিয়ার আল আঝারি চত্বরে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে গুলির ঘটনা ঘটে। তারতুস প্রদেশের বানিয়াসে একটি পুলিশ স্টেশনে নিক্ষেপ করা হয় হ্যান্ড গ্রেনেড। অজানা আততায়ীদের এই হামলায় নতুন করে ভয় ছড়িয়ে পড়ে জনমনে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শুধু লাতাকিয়াতেই চারজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন নিরাপত্তা সদস্য ও সাধারণ নাগরিক। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সংঘর্ষে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে আলাওয়ি সম্প্রদায়ের গভীর ক্ষোভ আর আশঙ্কা। সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ছিলেন এই সম্প্রদায়েরই সদস্য। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও তাঁর পতনের পর আলাওয়িরা নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করছেন। হামলার দায় স্বীকার করেছে সারায়া আনসার আল সুন্না নামে একটি স্বল্পপরিচিত গোষ্ঠী, যারা প্রকাশ্যে জানিয়েছে আলাওয়িদের লক্ষ্য করেই এই আক্রমণ।
বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন ঘাজাল ঘাজাল নামে এক আলাওয়ি ধর্মীয় নেতা, যিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি রাজনৈতিক ফেডারেল ব্যবস্থা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তোলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপকূলীয় শহরগুলোতে মানুষ জড়ো হয়। তবে এসব এলাকায় সরকারপন্থী পাল্টা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। কোথাও পাথর ছোড়া, কোথাও মারধর, কোথাও আবার রক্ত ঝরার দৃশ্য।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী শহরের কেন্দ্রগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, আইনবহির্ভূত গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার কি পারবে এই ক্ষতবিক্ষত সমাজে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে।
আলাওয়িরা সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী। জনসংখ্যার প্রায় এক দশমাংশ হলেও দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদের প্রভাব ছিল প্রবল। আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশজুড়ে একাধিকবার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা দিয়েছে। গত মার্চে উপকূলীয় শহরগুলোতে সংঘর্ষে প্রায় চৌদ্দশ মানুষের প্রাণ যায় বলে তদন্তে উঠে আসে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে সরকারি মিত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা বারবার জাতীয় ঐক্য আর অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার কথা বলছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস আর ক্ষত সহজে সারে না। শুধু আলাওয়ি নয়, দ্রুজ ও কুর্দিসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেন্দ্রীয় সরকারের সীমিত ক্ষমতা আর আস্থার ঘাটতি তাদের বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জোরালো করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সামনে দুটো পথ খোলা। একদিকে সংলাপ ও সমঝোতার পথে এগোলে উত্তেজনা কমতে পারে। অন্যদিকে সহিংসতা চলতে থাকলে সিরিয়া আবারও গভীর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অতল গহ্বরে পড়ে যেতে পারে। অনেকের চোখে দেশটি এখন বিপজ্জনক এক কিনারায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ধাক্কাতেই ইতিহাসের পুরোনো দুঃস্বপ্ন ফিরে আসতে পারে।
রক্ত আর দাবির এই সন্ধিক্ষণে সিরিয়ার সামনে একটাই প্রশ্ন, শান্তির পথে হাঁটবে দেশ, নাকি নতুন করে অশান্তির অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
















