ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন ৩টি কূপ খননের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি বাংলাদেশের ইতিহাসেই প্রথম এবং সর্বাধিক গভীর অনুসন্ধানমূলক কূপ। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) মনে করছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এসব কূপ উৎপাদনে এসে দৈনিক অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করতে সক্ষম হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে তিতাসের গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের চলমান জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে এটি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে।
জেলার সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় এই সর্বাধুনিক ও সর্বাপেক্ষা গভীরতম অনুসন্ধান কূপটি খনন করা হচ্ছে। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে গভীর তলদেশে পরিচালিত এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জ্বালানি উত্তোলনের একটি নতুন যুগে পদার্পণ করছে, যা বর্তমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, তিতাসের এই নির্দিষ্ট অনুসন্ধান অঞ্চলে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন (টিসিএফ) ঘনফুট গ্যাসের বড় ধরনের মজুদ পাওয়া যেতে পারে।
সর্বোচ্চ চাপ ও তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্য সংবলিত ৩১ নম্বর কূপটির গভীরতা ধরা হয়েছে ৫,৬০০ মিটার। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে এর খননকাজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় (এর পূর্বে ১৯৬৯ সালে সর্বোচ্চ ৩,৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা সম্ভব হয়েছিল)। ইতোমধ্যে ৪,৬৩৭ মিটার পর্যন্ত খনন সম্পন্ন করা গেছে। বিজিএফসিএল-এর লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের মধ্যেই খনন পর্ব শেষ করে কেবল এই একটি কূপ থেকেই জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের সক্রিয় ২৩টি কূপ হতে দিনে গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়ে আসছে, যার সর্বোচ্চ খনন গভীরতা ৩,৭০০ মিটার। তবে পুরনো কূপগুলোর গ্যাস সঞ্চয় এবং ভেতরের চাপ কমে আসায় সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তিতাসের গ্যাস উৎপাদনের মূল সামর্থ্য পুনরুদ্ধার ও বর্ধিত করতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ খননের মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় বিজিএফসিএল। বর্তমানে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের খনন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং এটি শেষ হওয়ামাত্র একই সরঞ্জাম দিয়ে ৩০ নম্বর কূপটির কাজ শুরু করা হবে।
প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রসঙ্গে গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব উল্লেখ করেন যে, সফলভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হলে এই তিন কূপ মিলিয়ে গড়ে দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ২৯ নম্বর কূপের খনন ইতোমধ্যে ২,৮৬০ মিটারে পৌঁছেছে এবং কোনো কারিগরি বাধা তৈরি না হলে আগামী দুই মাসের মাঝেই এটি সমাপ্ত হবে। এরপরই ৩০ নম্বর কূপের খননে যাবে দল। অপরদিকে ৩১ নম্বর কূপটির গভীরতা বেশি এবং অতিরিক্ত চাপ ও তাপমাত্রায় খনন পরিচালনায় নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিধায় এটি শেষ হতে আরও তিন থেকে চার মাস বাড়তি সময় লাগতে পারে। তবে সব মিলিয়ে আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে তিনটি কূপেরই কাজ চূড়ান্ত করার প্রাথমিক প্রাক্কলন করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক আরও ব্যাখ্যা করেন, পূর্বে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩,৭০০ মিটার গভীরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও এর নিচে কী পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তা এতদিন অজানা ছিল। ১৯৬৯ সালে ৩,৭০০ মিটার গভীরে পৌঁছানোর পর একটি প্রচণ্ড উচ্চচাপ অঞ্চল ধরা পড়ে, যার কারণে তৎকালীন সময়ে আর গভীরে যাওয়া সম্ভবপর হয়নি। তবে বর্তমান জ্বালানি সংকট বিবেচনায় এনে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক, মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার নির্দেশে এই তলদেশের প্রকৃত অবস্থা জানার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই প্রকল্পটির মূল বিশেষত্ব হলো এটি একটি বৈপ্লবিক অনুসন্ধানী কাজ, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চচাপ ও উচ্চতাপ অঞ্চল পেরিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। পূর্বের ভূকম্পন জরিপ বা সিসমিক স্টাডির তথ্যানুসারে এখানে ২ টিসিএফ সম্ভাব্য গ্যাস সম্পদের সন্ধান মেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএলের অধীনে থাকা অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে অকার্যকর কূপগুলোর ‘ওয়ার্কওভার’ ও নতুন করে কূপ খননের বাড়তি উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
খননকাজের ভবিষ্যৎ সুবিধা তুলে ধরে বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামানিক প্রত্যাশা প্রকাশ করেন যে, আগামী ছয় মাসের মাথায় তারা এই তিন কূপের গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় দিতে সক্ষম হবেন। যদিও দেশের বিপুল চাহিদার তুলনায় এটি হয়তো অনেক বেশি নয়, তবুও বৈদেশিক এলএনজি আমদানির নির্ভরতা কিছুটা কমানোর ক্ষেত্রে এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ যেখানে সরকারি কোম্পানি থেকে প্রতি ইউনিট গ্যাস মাত্র ১ টাকার কাছাকাছি খরচে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিদেশ থেকে আনতে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা অতিরিক্ত গুণতে হয়। ফলে দেশীয়ভাবে এই ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
Reporter Name 
















