নির্বাচনের প্রাক্কালে সহিংসতা, রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও অদৃশ্য টার্গেট তালিকা
ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর প্রশ্ন উঠছে—আর কারা টার্গেটে? আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, রাজনৈতিক হিসাব ও নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা বিশ্লেষণ।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার চেষ্টা শুধু একটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা হাদির ঘটনা দেশকে আবারও সেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—তিনি কি একমাত্র টার্গেট, নাকি সামনে আরও নাম রয়েছে?
জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে তাদের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত হত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত দমন-পীড়ন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দখলের দায় স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দলটি নতুন বাস্তবতায়ও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে হাদির ওপর হামলা অনেকের কাছেই সেই অসমাপ্ত জবাবদিহিরই একটি রক্তাক্ত বহিঃপ্রকাশ।
নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় একজন তরুণ ও সক্রিয় রাজনৈতিক কণ্ঠকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাই স্পষ্ট করে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকলেও বাস্তবে তাদের সক্ষমতা ও মনোবল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ভূমিকা, পাল্টা জনরোষ এবং কাঠামোগত সংস্কারের অভাব এখনো বাহিনীগুলোকে পুরোপুরি কার্যকর করে তুলতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হাদির ওপর হামলার পেছনে দুটি বড় বাস্তবতা কাজ করছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিয়োগ, ভাঙা মনোবল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক শূন্যতায় নতুন করে ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার প্রতিযোগিতা। ছোট-বড় রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় শক্তি এবং নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্বের স্বপ্নে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ ও ‘জুলাই সনদ’ এই প্রত্যাশাকে আরও উসকে দিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো—নির্বাচনের পরও ‘জুলাই সনদ’ সাংবিধানিক রূপ পেতে সময় লাগবে, আর সেই মধ্যবর্তী সময়টাই হয়ে উঠতে পারে অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। হাদির ওপর হামলাকে অনেকেই তাই সরাসরি নির্বাচন বানচাল বা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক মাঠে এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বিএনপির অতীত শাসন অভিজ্ঞতা থাকলেও দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে দলটি সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও নিষেধাজ্ঞার পরও সংগঠিত কাঠামো ধরে রেখে সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন করেছে। এই টানাপোড়েনের ফাঁকেই সক্রিয় হওয়ার সুযোগ খুঁজছে আওয়ামী লীগের সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী, যাদের রাজনৈতিক আশ্রয় ও অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হিসেবে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার নাম বারবার উঠে আসছে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, রাজনৈতিক ভাষা তত কঠোর হবে, বিভাজন তত গভীর হবে। এই পরিস্থিতিতে হাদির মতো কণ্ঠগুলো—যারা অন্যায়, আধিপত্যবাদ ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলে—তারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। প্রশ্ন তাই শুধু ‘হাদির পর কে টার্গেট?’ নয়, বরং রাষ্ট্র কি এই টার্গেট রাজনীতি ঠেকাতে পারবে?
যদি দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করা না যায়, যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একসঙ্গে কার্যকর না হয়, তাহলে হাদির ওপর হামলা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে ভবিষ্যৎ অস্থিরতার পূর্বাভাস হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।















