মেক্সিকোর মহাকাশ ও উড়োজাহাজ উৎপাদন খাত দ্রুত সম্প্রসারণের পথে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএর আসন্ন পর্যালোচনাকে ঘিরে এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান ও শুল্ক আরোপের হুমকির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম বলেন, দেশটির মহাকাশ শিল্প আগামী চার বছরে বার্ষিক গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। শক্তিশালী উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানির উপস্থিতিকে তিনি এই অগ্রগতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ইউএসএমসিএ পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সেই আশাবাদ কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউএসএমসিএ মেক্সিকোকে উত্তর আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম উড়োজাহাজ যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী হিসেবে মেক্সিকোর অবস্থান শক্ত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ এবং চুক্তি বাতিলের ইঙ্গিত বিনিয়োগ স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রোডেনসার পরিচালক মনিকা লুগো বলেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং হঠাৎ সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে খাতটি মূলধন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইউএসএমসিএ মেয়াদ শেষে নবায়ন নাও করতে পারে কিংবা আলাদা আলাদা চুক্তির পথে যেতে পারে। এই মন্তব্য মেক্সিকোর শিল্পখাতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বর্তমানে মেক্সিকোর মহাকাশ বাজারের মূল্য প্রায় ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৯ সালের মধ্যে বেড়ে ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে দেশটির শিল্প ফেডারেশনের তথ্য। বোম্বারডিয়ার, সাফরান, এয়ারবাস ও হানিওয়েলের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মেক্সিকোতে উৎপাদন কার্যক্রম গড়ে তুলেছে।
কুয়েরেতারো রাজ্যের কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০০৫ সালে বোম্বারডিয়ারের আগমনের পর সেখানে বিশেষায়িত এয়ারোনটিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে, যা দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়তা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, কম মজুরির কারণে ভবিষ্যতে আরও উন্নত উৎপাদন ও সমাবেশ কাজ মেক্সিকোতে স্থানান্তরিত হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব মেশিনিস্টস অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন জানিয়েছে, তারা চায় মেক্সিকোতে শ্রমমান ও মজুরি বাড়ুক, যাতে প্রতিযোগিতা ন্যায্য হয়।
মেক্সিকো সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যূনতম মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ন্যূনতম মজুরি প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরির ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।
ইউএসএমসিএর শর্ত অনুযায়ী মেক্সিকোকে তথাকথিত ‘প্রোটেকশন ইউনিয়ন’ ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে বলা হয়েছে, যেখানে শ্রমিকদের অজান্তেই মালিকপক্ষের অনুকূলে চুক্তি করা হতো। যদিও ২০১৯ সালের শ্রম সংস্কারের পর আইন পরিবর্তন হয়েছে, তবু স্বাধীন ইউনিয়ন গঠনে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে বলে শ্রম বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, মেক্সিকোর মহাকাশ শিল্প একদিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখালেও অন্যদিকে ইউএসএমসিএ পর্যালোচনা, শ্রমমান বিতর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে এই অগ্রযাত্রা থমকে যেতে পারে।
















