ভারতের হীরার কেন্দ্র সুরাটে একসময় যেসব শ্রমিকরা হীরাকাটা শিল্পের ওপর ভর করে স্থিতিশীল আয়ের স্বপ্ন দেখতেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আর বাজার সংকোচনের আঘাতে সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে পড়ছে। হাজারো পরিবার যেমন আয়ের পতনে বিপর্যস্ত, তেমনি তাদের শিশুদের পড়াশোনাও থমকে গেছে।
সুরাটের শ্রমিক আলপেশ ভাই তার তিন বছরের মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন ২০১৮ সালে—একসময় যেটি তার কাছে ছিল কল্পনার মতো। হীরাকাটা শিল্পে মাসিক ৩৫,000 রুপি আয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন সন্তানদের ভালো শিক্ষার সুযোগ করে দেবেন। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সরবরাহ সংকট ও ছাঁটাইয়ের ফলে তার আয় কমতে থাকে, আর স্কুল ফি মেটানো কঠিন হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের শুরুতে তিনি বাধ্য হয়ে সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করান। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্কে হীরাবাজার আরও ধসে পড়লে তার কারখানাও ৬০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করে। আলপেশও চাকরি হারান। এখন তিনি কষ্টেসৃষ্টে টেক্সটাইল মালামাল ওঠানামার কাজ করে মাসে প্রায় ১২,০০০ রুপি আয় করেন।
তিনি বলেন, “মেয়েরা কখনো কখনো বলে—পাপা, এখন পড়াশোনা আগের মতো ভালো না। আমি বলি, আবার ফিরিয়ে দেব বেসরকারি স্কুলে, কিন্তু জানি না কবে পারব।”
সুরাটের হীরাশিল্পে ৬ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করেন। বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে এসে এখানে বসতি গড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ঝড় বিপুল ক্ষতির মুখে ফেলেছে শহরটিকে। গত ১২-১৪ মাসে প্রায় ৫০,০০০ শ্রমিক সুরাট ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। স্কুলে ভর্তি কমে যাওয়া ও শিক্ষার্থীদের মাঝপথে স্কুল ছাড়ার হার বেড়েছে।
ঝাঁপিয়ে পড়া সংকটে অনেক পরিবারই সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিক্ষেত্রে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন।
ডায়মন্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ভাবেশ ট্যাঙ্ক বলেন, “এমন exodus আগে দেখা যায়নি। ভর্তি কমেছে মানে তারা শিগগিরই ফিরবে না।”
সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান কম হওয়ায় পরিবারগুলোর কষ্ট আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির সরকারি স্কুলের মাত্র ২৩.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্বিতীয় শ্রেণির মান অনুযায়ী পড়তে পারে—যেখানে বেসরকারি স্কুলে এই হার ৩৫.৫ শতাংশ।
হীরাশ্রমিকদের আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৭১ জন শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন বলে ইউনিয়নের তথ্য। মানসিক চাপ, আয় কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
গুজরাট সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হীরাশ্রমিকদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে, যার আওতায় বেকার শ্রমিকদের সন্তানদের এক বছরের স্কুল ফি সরকার দেবে। কিন্তু কঠোর যোগ্যতার কারণে অনেকে বাদ পড়েছেন। বহু আবেদনপত্র ‘ভুল তথ্যের’ কারণে বাতিল হওয়ায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ।
হতাশার শেষ উদাহরণ—দিব্যাবেন মাকওয়ানা। তার ২২ বছর বয়সী ছেলে কেভালভাই তিন বছর ধরে হীরা পালিশ করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর মানসিক চাপে জুনে আত্মহত্যা করেন। দিব্যাবেন বলেন, “এখন আমার কাছে শুধু ঋণ আছে। ছেলে নেই।”
তিনি এখন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান, আর ছোট ছেলে কারমদীপ হীরাকাটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে—আশা, বাজার ফের সচল হলে হয়তো ঋণ শোধ করতে পারবে।
দিব্যাবেনের কথায়, “শিক্ষা কিস্তিতে নেওয়া হোক বা বিনা পয়সায়—জীবন বদলাতে পারবে কি না জানি না। আমাদের ভরসা এখনো সেই হীরাই।”
















