ভিসা অপব্যবহার ও প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হারের কারণে কঠোর নীতি— ৫% সীমা মানতে চাপ, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বন্ধ
ভিসা অপব্যবহার আশঙ্কা ও কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাজ্যের অন্তত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি এড়াতে নিয়ম পরিবর্তন করেছে।
যুক্তরাজ্যের অন্তত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিসা অপব্যবহার ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয় দুই দেশের শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে।
ব্রিটিশ সরকার বলছে, শিক্ষার্থী ভিসাকে আশ্রয় পাওয়ার ‘কৌশল’ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষা মন্ত্রী ডেম অ্যাঞ্জেলা ঈগল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন— উচ্চশিক্ষার ভিসা কখনোই যুক্তরাজ্যে থাকার বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত শিক্ষার্থী বাছাইয়ে আরও কঠোর হতে বাধ্য হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার ২০২৬ সালের শরৎ পর্যন্ত পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রেখেছে, ‘অপ্রত্যাশিতভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যান বেড়ে যাওয়ায়’— এমন কারণ দেখিয়ে। ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্নাতক শিক্ষার্থীদের আবেদন নিচ্ছে না। সান্ডারল্যান্ড ও কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ও একইভাবে দুই দেশ থেকেই ভর্তি স্থগিত করেছে।

সান্ডারল্যান্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার্থী ভিসা মানদণ্ড রক্ষায় তারা যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যের নতুন বিসিএ (বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট) নিয়ম কার্যকর হয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিশ্চিত করতে হবে ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বেশি যেন না হয়— আগে যা ছিল ১০ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান হয়েছে ১৮% এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে ২২%— যা সীমার দ্বিগুণেরও বেশি।
এই সময়ে মোট ২৩ হাজার ৩৬টি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যার অর্ধেকই এসেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে। একই বছরে আশ্রয়ের আবেদনও বেড়েছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও কর্মভিত্তিক ভিসায় আসা নাগরিকদের মধ্যেই এই সংখ্যা বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, কঠোর নিয়মের কারণে তারা ঝুঁকি প্রশমনের কৌশল হিসেবে ভর্তি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারকে কঠোর কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে, আর গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি কয়েকটি প্রোগ্রামে ভর্তি স্থগিত রেখে জানুয়ারি থেকে পুনরায় ভর্তি চালু করেছে। অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটিও জানুয়ারি ২০২৬ সেশনে দুই দেশের শিক্ষার্থী নিচ্ছে না।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি গত গ্রীষ্মে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে, যেখানে ভর্তিচ্ছুদের ৬০ শতাংশই ভিসা প্রত্যাখ্যাত হয়।
‘এডভ্যান্স অ্যাডভাইজারস’-এর প্রতিষ্ঠাতা মরিয়ম আব্বাস বলেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে আবেদন আটকে যাওয়ায় প্রকৃত শিক্ষার্থীরা হতাশ হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি শিক্ষার্থী নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ‘উভয় সংকটে’— ভিসা নীতি মানা এবং বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থী ভর্তির ভারসাম্য রক্ষা করা।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথ বলেন, কঠোর নিয়ম অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও আস্থা বজায় রাখতে এবং ভিসা অপব্যবহার রোধে এটি প্রয়োজনীয়।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের তারা মূল্য দেয় এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারে, সে কারণেই নীতিগুলো কঠোর করা হয়েছে।
















