ওষুধশিল্পের কৌশলগত রূপান্তর, আমদানিনির্ভরতা কমানো ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব ও তদারকির দাবি বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং জাতীয় স্বাস্থ্য–নিরাপত্তা জোরদার করতে এপিআই নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে এএইচআরবি। প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি নজরদারি নিশ্চিত হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে বড় অগ্রগতি আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকাশঃ ০৭ ডিসেম্বর,২০২৫ | আপডেটঃ ০৮ ডিসেম্বর,২০২৫
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে কৌশলগতভাবে রূপান্তর এবং জাতীয় স্বাস্থ্য–নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ (এএইচআরবি)। রোববার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে এ নীতিকে ‘জাতীয় স্বার্থে শীর্ষ অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এএইচআরবি’র আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন। তারা জানান, দেশে প্রায় সব ধরনের ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এপিআইয়ের বড় অংশ আমদানিনির্ভর; ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে উৎপাদনব্যবস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য–নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। করোনাকালে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এপিআই, ভ্যাকসিন, আইভিডি এবং চিকিৎসা–সরঞ্জাম উৎপাদনে দ্রুত দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য গবেষণা–উন্নয়নে (আর অ্যান্ড ডি) সরকারি প্রণোদনা, ধারাবাহিক অনুদান এবং উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের পর ধাপে ধাপে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক সফলতার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, বড় নীতি বাস্তবায়নে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং কঠোর তদারকি অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে রূপান্তর না ঘটলে দেশের ট্যাক্স–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচেই থাকবে। অথচ ওষুধখাত বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম—ভারতে যেখানে মোট রপ্তানির ৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, বাংলাদেশে তা এখনো মাত্র ০.৫ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্ঞানের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোয়েল মকিয়ের উদ্ধৃত করা হয়—‘জ্ঞানই আধুনিক অর্থনীতির প্রধান চালক।’
এপিআই নীতি বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি জরুরি পূর্বশর্তও তুলে ধরে এএইচআরবি—
১) প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত বাধা দূর করা
২) আকর্ষণীয় প্রোডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ (পিএলআই) চালু
৩) আর অ্যান্ড ডি–তে ধারাবাহিক সরকারি অনুদান
৪) অ্যাকাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা জোরদার
৫) নির্দিষ্ট সময়সীমায় বাস্তবায়নযোগ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন
চিঠিতে আরও বলা হয়, এ নীতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে এগোবে না; তাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সরাসরি নজরদারি প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার সক্রিয় তদারকি থাকলে এপিআই নীতি কাগুজে অবস্থায় আটকে থাকবে না, আমদানি নির্ভরতা কমবে, রপ্তানি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ট্যাক্স–জিডিপি অনুপাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
চিঠির ভাষ্যে উল্লেখ করা হয়—এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা, সক্ষমতা ও জনস্বাস্থ্য–নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত কৌশলগত রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।
















