যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট প্রিজনের ভেতরে বন্দিদের টিকে থাকতে যে গোপন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তা যেন কারাগারের কঠোর বাস্তবতারই আরেক প্রতিফলন। কারাগারের ভেতর শ্রমমূল্য মেলে মাত্র কয়েনের বিনিময়ে—এমন বাস্তবতায় অনেক বন্দিকেই বেঁচে থাকার জন্য নির্ভর করতে হয় নিজস্ব “হাসল” বা ছোটখাট কাজের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিজন পলিসি ইনিশিয়েটিভের তথ্য অনুযায়ী, কারাবন্দিরা দিনে ০.৮৬ ডলার পর্যন্ত কম উপার্জন করেন। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য প্রতি ঘণ্টায় কয়েক সেন্ট থেকে ০.৫২ ডলার পর্যন্ত মজুরি দেয় কিছু রাজ্য; কোথাও–কোথাও আবার কাজ করেও কোনো পারিশ্রমিক মেলে না। অথচ কমিসারি বা ফোন সেবার উচ্চমূল্যে প্রতিবছর প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন বন্দিরা, যেখানে পণ্যের দাম বাইরের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি পর্যন্ত।
এই পরিস্থিতিতে বন্দিদের অনেকেই নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে তৈরি করেছেন দ্বিতীয় এক আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি। কেউ সেলাই করেন, কেউ ছোট আকারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করেন, কেউ আবার নষ্ট ফ্যান কিংবা পোশাক মেরামত করেন—বিনিময়ে পাওয়া যায় ‘স্ট্যাম্প’, যা কারাগারের ভেতর এক ধরনের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এক বন্দি, পরিচিত ‘জ্যাক’, কারাগারের প্যান্ট্রি বিভাগে কাজ করেন—৩৬৫ দিন কাজ করেও মাসে পান মাত্র শত ডলারের একটু বেশি। পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় বেঁচে থাকার জন্য তিনি অন্য বন্দিদের পোশাক সেলাই করে দেন স্ট্যাম্পের বিনিময়ে। দুটি বই স্ট্যাম্পে তিনি তৈরি করে দেন একটি পুরো পোশাক সেট। পানি কেনার জন্যই তাঁর সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়, কারণ কারাগারের ট্যাপের পানি তাঁর মতে পানযোগ্য নয়।
আরেকজন বন্দি জশ কারাগারের ভেতর চালান ‘কর্নার স্টোর’-এর মতো খাদ্য ব্যবসা। কমিসারিতে কোনো পণ্য না থাকলে বা সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলে বন্দিরা তাঁর কাছেই যান। জশ সামান্য মুনাফা যোগ করে বিক্রি করেন কুকিজ, চিজ, কিংবা রান্নাঘর থেকে গোপনে আনা মরিচ। সরবরাহ সীমিত হয়ে গেলে দাম আরও বেড়ে যায়। তিনি ক্রেডিটও দেন, তবে সুদের হার তখন বেশি।
৫২ বছর বয়সী মার্টিন রোব্লেস নষ্ট ফ্যান, ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা পোশাক মেরামত করে উপার্জন করেন। তিনি বলেন, তাঁর কাজ তাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানসিক শক্তি দেয়। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের কষ্ট হলেও বন্দিদের ভরসার জায়গা তিনি।
এই সব ‘হাসল’ বন্দিদের কাছে বিলাস নয়, বরং টিকে থাকার উপায়—কখনও প্রিয়জনকে উপহার পাঠানোর পথ, কখনও আবার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।
কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের তৈরি এই দ্বিতীয় অর্থনীতি দেখায়, সীমাবদ্ধতা যত কঠোর হয়, টিকে থাকার উদ্ভাবনও ততই তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে—নীরব লেনদেন আর অদৃশ্য শ্রমের ভেতর দিয়ে।
















