জাপানে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গত এক বছরে ১৮ হাজারেরও বেশি প্রবীণ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১২ সালের তুলনায় এসব ঘটনা এখন দ্বিগুণ, যা বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে কর্মশক্তির ঘাটতি এবং বিদেশি সেবাকর্মী নিয়োগে কঠোর নীতি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন ব্যয় বেড়ে ২০৩০ সালে ডিমেনশিয়া-সম্পর্কিত সেবা ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৪ ট্রিলিয়ন ইয়েনে।
এই চাপ কমাতে সরকার তাদের সর্বশেষ পরিকল্পনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
দিকভ্রান্ত প্রবীণদের খুঁজে পেতে দেশজুড়ে জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। কিছু অঞ্চলে মানুষজনকে এমন পরিধানযোগ্য জিপিএস ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়লেই কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা পায়। আবার কোথাও দোকানকর্মীরাও রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন পান, যাতে দ্রুত নিখোঁজ প্রবীণদের শনাক্ত করা যায়।
এ ছাড়া ডিমেনশিয়া শনাক্তে নতুন প্রযুক্তিও উন্নয়ন হচ্ছে। ফুজিৎসুর aiGait সিস্টেম চলাফেরা ও দেহভঙ্গি বিশ্লেষণ করে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে—যেমন হাঁটার সময় পা টেনে চলা, ঘুরতে ধীরগতি বা দাঁড়াতে সমস্যা হওয়া। ফুজিৎসুর মুখপাত্র হিদেনোরি ফুজিওয়ারা বলেন, চিকিৎসকেরা এই ধরনের ডেটা ব্যবহার করে আগেভাগে চিকিৎসায় হস্তক্ষেপ করতে পারলে রোগীর সক্রিয় জীবনযাপন দীর্ঘায়িত হতে পারে।
গবেষকেরা পরিচর্যার রোবট নিয়েও কাজ করছেন। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি AIREC নামের ১৫০ কেজি ওজনের হিউম্যানয়েড রোবট মোজা পরানো, ডিম ভাজা থেকে কাপড় ভাঁজ করা পর্যন্ত কাজে সহায়তা করতে পারে। ভবিষ্যতে এটি ডায়াপার পরিবর্তন এবং বেডসোর প্রতিরোধেও সহায়তা করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানের কিছু পরিচর্যা কেন্দ্রে ইতোমধ্যেই রোবট ব্যবহার হচ্ছে। তারা সঙ্গীত বাজায়, ব্যায়াম করায় এবং শয্যা পর্যবেক্ষণ করে রোগীদের ঘুম ও শারীরিক অবস্থার খোঁজ রাখে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, পুরোপুরি নিরাপদ মানব-রোবট সহায়তা নিশ্চিত করতে আরও অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে ছোট আকারের সহচর রোবটও তৈরি হয়েছে। শার্পের Poketomo নামের ১২ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই রোবটটি সঙ্গে বহন করা যায় এবং এটি ওষুধ খাওয়ার স্মরণ করিয়ে দেওয়া, আবহাওয়ার তথ্য জানানোসহ একাকী মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করতে পারে।
তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, যত প্রযুক্তিই আসুক মানবিক সংযোগের বিকল্প নেই। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর তামোন মিয়াকে বলেন, “রোবট মানুষের কাজকে সহায়তা করবে, প্রতিস্থাপন নয়।”
টোকিওর সেনগাওয়ায় ‘রেস্টুরেন্ট অফ মিস্টেকেন অর্ডারস’-এ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষরাই ওয়েটার হিসেবে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠাতা আকিকো কান্না চান, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষজন সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকুক, উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন কাটাক।
রেস্তোরাঁর কর্মী তোশিও মোরিতা বলেন, তিনি মানুষের সঙ্গে দেখা–সাক্ষাতে আনন্দ পান। তার স্ত্রী জানান, এই জায়গা তার স্বামীর মানসিক সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখছে।
শেষ পর্যন্ত, জাপানের ডিমেনশিয়া সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, প্রকৃত সহায়তা তৈরি হয় পরিবার, সমাজ ও মানুষের পারস্পরিক বন্ধনে—যা কোনো যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
















