যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূতরা ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি প্রস্তাব নিয়ে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্যে মস্কোর পথে রওনা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউস আগাম ঘোষণা করেছে—চুক্তি হওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী। কিন্তু কিয়েভের হৃদয়ে এখনও অনিশ্চয়তার কাঁটা, কারণ আলোচনার টেবিলে বসলেও খসড়াটি এখনো রাশিয়ার শর্তের ভারে নুয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকের আগে রবিবার ও সোমবার ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনায় প্রস্তাবের ভাষা কিছুটা বদলালেও, কিয়েভের চোখে তা এখনো গ্রহণযোগ্য পথ নয়। যুদ্ধের ক্ষত বয়ে চলা ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তাদের ভূমির অখণ্ডতা কি সত্যিই বজায় থাকবে?
রাশিয়ার রাজধানীতে যাচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। দীর্ঘদিনের নীরব কূটনীতিকে সরিয়ে রেখে হঠাৎ এমন উদ্যোগ—এ যেন এক ভারী আকাশে দূরের বজ্রপাতের মতো, যার শব্দে পুরো অঞ্চল কেঁপে উঠেছে।
ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা যে সহজ নয়, সে হতাশা ইতোমধ্যেই প্রকাশ করেছেন। গত সপ্তাহে ফাঁস হওয়া ২৮ দফা খসড়াটি তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়—কারণ এতে ইউক্রেনকে বিপুল এলাকা ছেড়ে দিতে বলা হয়, সামরিক শক্তি সীমিত করতে বলা হয় এবং ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে বলা হয়। যেন একটি পরাজয়ের কাগজে সই করতে বাধ্য করা হচ্ছে কিয়েভকে।
পরে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মতামত যুক্ত হওয়ায় পরিকল্পনার ভাষা কিছুটা পাল্টালেও পুরো বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন—রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা করাই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
পুতিন অবশ্য দাবি করেন—তিনি আলোচনায় প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রস্তাবকে ভবিষ্যৎ চুক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠোর হুমকি—ইউক্রেন রাজি না হলে রাশিয়ান বাহিনী আরও অগ্রসর হবে। তার নিজের ভাষায়, “ইউক্রেনীয় সেনারা যদি তাদের অবস্থান ছাড়ে, যুদ্ধ থামবে। না হলে আমরা শক্তি দিয়ে তা অর্জন করব।”
পূর্ব ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার কিছু অগ্রগতি হয়েছে। পুতিন দাবি করেছেন—তারা পোকরোভস্ক দখল করেছে। তবে কিয়েভ বলছে—উত্তরের অংশ এখনো তাদের হাতে, এবং তারা পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে।
প্যারিসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর জেলেনস্কি মন্তব্য করেন—নতুন খসড়া আগের চেয়ে কিছুটা ভালো, কিন্তু ভূখণ্ডের প্রশ্নই সব আলোচনার গলায় সবচেয়ে শক্ত বেঁধন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁও বলেছেন—এটি হয়তো একটি “মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত”, কিন্তু চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করবে ইউক্রেনই।
পরিসংখ্যানের ভাষা আরও নির্মম—যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষই তাদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করতে চায় না।
এ যুদ্ধ যেন এক অনন্ত রাত্রির মতো—যেখানে আলোচনার টেবিলে বসে কেউ শান্তির ভোর খোঁজে, আর মাঠে ঝরে পড়ে মানুষের স্বপ্ন, ঘরবাড়ি, জীবন আর ভবিষ্যৎ। মস্কোয় বৈঠক হবে, কাগজে লেখা বদলাবে—কিন্তু হাজারো ইউক্রেনীয়ের মনে প্রশ্ন রয়ে যাবে, এই যুদ্ধের শেষ রেখা কি সত্যিই আঁকা সম্ভব, নাকি তা কেবলই দূরের মরীচিকা?
















