মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান দল এখন গভীর এক মতভেদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ১৫ নভেম্বর জর্জিয়ার কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেন, অনেকেই এটিকে সাধারণ রাজনৈতিক নাটকেরই অংশ ভেবেছিলেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত দলটির ভেতরে আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়—কে নেতৃত্ব দেবে রক্ষণশীল রাজনীতিকে ট্রাম্প–পরবর্তী যুগে, এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণার প্রকৃত অর্থ কী হবে, তা নিয়ে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে।
এ লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বিদেশনীতি, বিশেষ করে ইসরাইল প্রশ্ন। বহু বছর পর রিপাবলিকান দলে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হচ্ছে এক জিজ্ঞাসা—ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত ইসরাইল সমর্থন কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য, বিশেষত ফিলিস্তিনে ন্যায়সঙ্গত শান্তির প্রত্যাশীদের জন্য, এই বিভাজন এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
গ্রিনের উত্থান এবং বিভক্ত রাজনীতি
মার্জোরি টেলর গ্রিন শুরুতে ছিলেন ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থকদের সারিতে, ‘মাগা’ আন্দোলনের অন্যতম মুখ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারার নতুন কণ্ঠ হিসেবে। ট্রাম্পের সাথে তার মতবিরোধ শুধু ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, বরং রিপাবলিকানদের দুই উদীয়মান গোষ্ঠীর লড়াই—ট্রাম্প–নির্ভর মাগা সমর্থক এবং স্বাধীন, হস্তক্ষেপবিরোধী জাতীয়তাবাদীদের মাঝে দ্বন্দ্ব।
মাগা গোষ্ঠীর নেতারা, যেমন মাইক জনসন ও লিন্ডসে গ্রাহাম, ইসরাইলকে শুধু কৌশলগত নয়, ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র মনে করেন। অন্যদিকে আমেরিকা ফার্স্ট শিবির মনে করে, বৈদেশিক যুদ্ধ ও সামরিক জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি হারাচ্ছে। তাদের মতে, ইসরাইলকে সীমাহীন সমর্থন দেওয়া আমেরিকার স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক।
এই মতভেদ এখন রিপাবলিকান দলের ভিতর অস্থিরতা তৈরি করেছে।
ইসরাইল প্রশ্নে নতুন বিতর্ক
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইল সমর্থন ছিল অটুট ও দ্বিদলীয়। কিন্তু গাজায় যুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয় সেই অবস্থানকে নাড়া দিতে শুরু করেছে, বিশেষ করে রিপাবলিকান তরুণদের মধ্যে। আমেরিকা ফার্স্ট শিবির ইসরাইলকে ওয়াশিংটনের একতরফা ব্যয়ের প্রতীক হিসেবে দেখে—যা ইউক্রেনকে সহায়তার বিরোধিতার মতোই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
অপরদিকে মাগা সমর্থকরা ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে ইসরাইলকে জড়িয়ে দেখেন। তাদের কাছে এটি কৌশলগত সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি আবেগী ও নৈতিক দাবি।
গ্রিন সম্প্রতি গাজার যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করায় তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এই বিতর্কই দেখাচ্ছে যে একসময়ের নিষিদ্ধ প্রশ্ন এখন রিপাবলিকান রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করছে।
২০২৫ সালের মার্চে পিউ জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ৫০ বছরের নিচে নেতিবাচক ইসরাইল–ধারণা ২০২২ সালের ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে—গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
বিদেশনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন
জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়কার ‘নব্যরক্ষণশীল’ দৃষ্টিভঙ্গি আজ রিপাবলিকান ঘাঁটিতে আর জনপ্রিয় নয়। ট্রাম্প ২০১৬ সালে ক্ষমতার পথে ওঠার সময় এই মতসংলগ্নতার বিরুদ্ধেই জনরোষকে কাজে লাগিয়েছিলেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’-এর বিরোধিতা করলেও ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন ছিল অটুট—জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর এবং গোলান মালভূমি স্বীকৃতি তারই প্রমাণ।
কিন্তু তার প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রিপাবলিকানদের ভিতরের দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আমেরিকা ফার্স্ট গোষ্ঠী ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দাবি করছে এমন এক নীতিতে, যেখানে বিদেশি জোট ও যুদ্ধের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে জাতীয় স্বার্থ।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কী অর্থ বহন করে
এই বিভাজন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ঝুঁকি ও সুযোগ দুটোই বয়ে আনতে পারে। ঝুঁকি হলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অস্থিরতা। তবে সুযোগ হলো রিপাবলিকানদের একাংশ এখন প্রশ্ন তুলছে—ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া কি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে?
এ মুহূর্তে আরব দেশগুলোর সামনে নতুন সম্ভাবনা—রিপাবলিকান ডানপন্থীদের সেই অংশের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হওয়া, যারা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী। এটি ফিলিস্তিনে ন্যায়বিচারের পক্ষে নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে।
যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে কাজে লাগানো যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল
রিপাবলিকানদের ভেতরের এই মতবিভেদ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। আরব বিশ্ব, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিন–সমর্থকদের কাছে এটি ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত—যখন ওয়াশিংটনের দীর্ঘস্থায়ী ইসরাইল–সমর্থন নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।
মাগা ও আমেরিকা ফার্স্টের এই লড়াই শুধু দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির দিকও পাল্টে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এই পরিবর্তনকে নীরবে পর্যবেক্ষণ করবে, নাকি সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে শান্তি, ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে আরও শক্তিশালী করবে।
















