মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)–এর সেন্ড মানি ও ক্যাশ-আউটের মাশুল শূন্যে নামানো গেলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ তারল্য ফিরতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে হলে এটিকে একটি ব্যয়সাপেক্ষ সেবা নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক আর্থিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)–এর আদলে ব্যাংকভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
বর্তমানে দেশে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। সরকারি ভাতা, প্রবাসী আয়, বেতন, ক্ষুদ্র ব্যবসার লেনদেন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কেনাকাটায়ও এসব সেবার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। তবে ক্যাশ-আউট ও অন্যান্য লেনদেনে আরোপিত মাশুল এখনো সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় ব্যয়ের কারণ হয়ে আছে।
বর্তমানে এমএফএস থেকে টাকা উত্তোলনে প্রতি হাজার টাকায় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত মাশুল গুনতে হয়। নিয়মিত লেনদেনকারী একজন গ্রাহকের জন্য বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পৌঁছে যায়। ফলে অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহী হন না কিংবা শেষ পর্যন্ত নগদ অর্থ ব্যবহারের পথই বেছে নেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উচ্চ মাশুল ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে অন্যতম বড় বাধা। তারা বলছেন, মাশুল কমানো বা পুরোপুরি তুলে দেওয়া গেলে নগদ অর্থের ব্যবহার কমবে এবং ডিজিটাল লেনদেন বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভারতের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতে ইউপিআই–ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে PhonePe, Google Pay, BHIM ও বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার করে একজন গ্রাহক বিনা খরচে অন্য ব্যাংক হিসাব বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) কিংবা ব্যক্তি থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (পিটুএম)—উভয় ধরনের লেনদেনেই গ্রাহককে কোনো অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ দিতে হয় না।
এই সুবিধার ফলে ভারতে ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে শুরু করে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহী হয়েছে। নগদ অর্থের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে অনুরূপ একটি আন্তঃব্যাংক ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এমএফএসের মাশুল শূন্যে নামানো বা ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে সবচেয়ে বড় সুফল পাবে ব্যাংকিং খাত। বর্তমানে অনেক গ্রাহক এমএফএসে টাকা গ্রহণের পর দ্রুত ক্যাশ-আউট করেন। কিন্তু ক্যাশ-আউট নিরুৎসাহিত হলে কিংবা অর্থ সহজেই ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করা গেলে গ্রাহকের একটি বড় অংশ ব্যাংকেই অর্থ জমা রাখবেন। এতে ব্যাংকের আমানত বাড়বে এবং তারল্য সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লে সেই অর্থ শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সহজ হবে। এতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থনীতিবিদেরা আরও বলছেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমবে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। প্রতিদিনের লেনদেনে অতিরিক্ত মাশুল গুনতে না হওয়ায় বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ তাঁদের হাতে থেকে যাবে। এতে পরিবারের ব্যয় কমবে এবং ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।
এ ছাড়া নগদ টাকার ব্যবহার কমে গেলে নতুন নোট ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও পুরোনো নোট প্রত্যাহারে সরকারের যে বিপুল ব্যয় হয়, তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও হ্রাস পাবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু মাশুল কমালেই হবে না। একই সঙ্গে ব্যাংক, এমএফএস, কিউআর পেমেন্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। আন্তঃব্যাংক ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন যত সহজ হবে, তত দ্রুত নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর সম্ভব হবে।
তাঁদের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জনে ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ী করতে হবে। এমএফএসের উচ্চ সার্ভিস চার্জ পুনর্বিবেচনা এবং ব্যাংকে সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি ব্যাংকিং খাতের তারল্য, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে।
















