সেনেগালের বিপর্যস্ত অর্থনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে দেশটির টানাপোড়েন যেন গভীরতর হচ্ছে, যদিও এই সংকটময় সময়ে আইএমএফের সহায়তাই তাদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আশ্রয়। কিন্তু বেইলআউটের শর্ত হিসেবে যে কঠোর ঋণপুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, সেটিই এখন ডাকার সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় সংশয় ও প্রতিবাদের বিষয়।
এ মাসের শুরুর দিকে ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি সেনেগালের মর্যাদা নামিয়ে দেয় জাঙ্ক বন্ডের গভীরে। তাদের মতে, ঋণের ভারে ন্যুব্জ দেশটির আর্থিক অবস্থা আতঙ্কজনক, ট্যাক্স সংগ্রহ বাড়ানোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ঋণসীমা ও সুদের বোঝা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষে দেশটির ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৯ শতাংশ।
বছরের পর বছর অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ধার-কর্জের পথ বেছে নিয়েছিল সেনেগাল। কিন্তু মহামারি আর বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির পর সেই ধারই পরিণত হয়েছে বিষে। আয় কমেছে, ব্যয় বেড়েছে, আর ঋণ-সমুদ্রে দেশটি আটকে পড়েছে আরও গভীরে।
এই ঋণখেলাপির পথে হাঁটতে না হয়—এ জন্য সরকার চায় দ্রুত আর্থিক ঘাটতি কমাতে। কিন্তু এসঅ্যান্ডপি বলছে, সরকার যে স্বপ্ন দেখছে, বাস্তব তার থেকে অনেক দূরে।
২০২৪-এর মার্চে বাসিরু দিয়োময়ে ফায়ে ক্ষমতায় আসার পরই শুরু হয় প্রকৃত অবস্থার অনুসন্ধান। রাষ্ট্রীয় অডিটে বেরিয়ে আসে আগের প্রশাসনের গোপন করা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। যে ঋণের কথা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দায় হিসেবে। আইএমএফ এটিকে ইচ্ছাকৃত লুকোচুরি বলেই আখ্যা দেয় এবং স্থগিত করে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা।
নতুন ঋণপ্যাকেজ নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু পথ যেন বারবার থেমে যাচ্ছে একই স্থানে। আইএমএফ চায় ঋণ পুনর্গঠন—যাতে মেয়াদ বাড়বে, সুদ কমবে, আর আর্থিক শৃঙ্খলা আসবে। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে মানে জনসেবা কমানো, উন্নয়ন থামানো, আর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো। এসবের শঙ্কায় প্রধানমন্ত্রী উসমান সোনকো ঋণপুনর্গঠনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার এই অবস্থান বাজারকে নাড়া দিয়েছে। বন্ডের দাম কমেছে, ঋণ বিমার ব্যয় বেড়েছে—বিনিয়োগকারীর আস্থা যেন ক্রমশ গলে যাচ্ছে।
তবে সোনকো বলছেন, সেনেগাল একটি গর্বিত জাতি; তারা ব্যর্থ রাষ্ট্রের মতো আচরণ মেনে নেবে না। বরং কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে পথ খুঁজতে চান তিনি, ঋণপুনর্গঠনের তিক্ততার বদলে।
কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। সোনকো ও প্রেসিডেন্ট ফায়ের মধ্যে অঘোষিত দ্বন্দ্ব রয়েছে। সোনকো নিজের অবস্থান থেকে নড়ছেন না, আবার ফায়েও চান না দেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হোক। এই অস্থিরতায় অর্থনীতিও যেন নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা হারাচ্ছে।
এদিকে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। সরকার ব্যয় কমাতে নতুন কর আরোপ করেছে—তামাক, অ্যালকোহল, জুয়া ও মোবাইল মানি লেনদেনে। সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগও শুরু হয়েছে। কিন্তু এই সবই যেন অদৃশ্য দড়ির ওপর হাঁটা—একটি ভুল পদক্ষেপেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ার ভয় রয়ে গেছে।
আগামী দিনের প্রশ্ন—সেনেগাল কি আইএমএফের কঠিন শর্ত মেনে নেবে, নাকি নিজেদের সামর্থ্যেই কোনো মধ্যপথ খুঁজে পাবে? যেটিই হোক, দেশের সামনে যে সময় আসছে, তা সহজ হবে না।
















