স্লোভেনিয়া আজ সিদ্ধান্তের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মৃত্যুর অনিবার্য পথযাত্রাকে কেমন মর্যাদায় শেষ করা যাবে—তা ঠিক করতে দেশটি ভোট দিচ্ছে একটি সংবেদনশীল আইনকে ঘিরে। এই আইন কার্যকর হলে কিছু মরণাপন্ন রোগী নিজের কষ্টের ইতি টানতে চিকিৎসকের সহায়তা নিতে পারবেন।
ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ আগেই এমন আইন করেছে। সেই পথ ধরে চলতে চেয়েছিল স্লোভেনিয়ার সংসদও—চলতি বছরের জুলাইয়ে পাস হয়েছিল একটি বিল। কিন্তু ডানপন্থী রাজনীতিক আলেস প্রিমচের নেতৃত্বে এক নাগরিক উদ্যোগ গণভোটে নিয়ে আসে বিষয়টি। এখন জনগণের রায়েই নির্ধারিত হবে আইনটি বাতিল হবে কিনা।
দেশটির ১৬ লাখ ৯০ হাজার ভোটারের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে—যদি অংশগ্রহণকারী ভোটারের অন্তত ২০ শতাংশ বিলের বিপক্ষে যায়, আইনটি আর কার্যকর হবে না।
আইনের সমর্থকেরা বলছেন, অপ্রশমিত যন্ত্রণা সহ্য করা মানুষের জন্য এটি হবে মুক্তির পথ। আর বিরোধীরা মনে করেন, রোগীদের মৃত্যু নয়, তাদের যত্নই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। তাদের অভিযোগ, এই আইন বয়স্ক ও দুর্বল মানুষকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
এর আগেই অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ডসহ কিছু দেশে স্বেচ্ছামৃত্যুকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেসব দেশে সাধারণত চিকিৎসকের অনুমোদন, অপেক্ষার সময়, এবং রোগীর মানসিক সক্ষমতার মতো কঠোর শর্ত থাকে। অনেক দেশেই রোগীদের নিজ হাতে ওষুধ গ্রহণ করতে হয়, চিকিৎসক সরাসরি প্রয়োগ করেন না।
স্লোভেনিয়ার প্রস্তাবিত আইনে ছিল দুই চিকিৎসকের অনুমতি, নির্দিষ্ট সময়ের বিরতি, এবং রোগীর সচেতন অবস্থায় নিজ হাতে ওষুধ গ্রহণের শর্ত—যা যুক্তরাজ্যের সদ্য পাস হওয়া আইনের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডেনেভনিক পত্রিকার প্রকাশিত এক জরিপ বলছে, প্রায় ৫৪ শতাংশ নাগরিক আইনটির পক্ষ সমর্থন করছেন, ৩১ শতাংশ বিরোধিতা করছেন এবং বাকিরা এখনো সিদ্ধান্তহীন।
প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলোব নাগরিকদের আহ্বান করেছেন মানবিক মর্যাদা রক্ষার পক্ষে ভোট দিতে—তার ভাষায়, ‘‘জীবনের শেষে কীভাবে বিদায় নেব, সেই স্বাধীনতা আমাদের সবার থাকা উচিত।’’
৮৬ বছর বয়সী মারিয়ান ইয়ানজেকোভিচও আইনটির সমর্থক। তার স্ত্রী আলেঙ্কা ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডে এক ক্লিনিকে নিজের জীবনাবসান করেন অসহনীয় যন্ত্রণার কারণে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘হুইলচেয়ারে বসে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা তাকে দেখা ছিল আমার জন্যও এক অসহনীয় কষ্ট।’’
বিরোধীরা অবশ্য এই আইনকে অমানবিক বলে দাবি করছেন। শিশু ও পরিবারের অধিকার নিয়ে কাজ করা এক রাজনৈতিক দল অভিযোগ করেছে, সরকার অসুস্থ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্যাথলিক গির্জার আর্চবিশপ স্তানিস্লাভ জোরে বলেছেন, ‘‘মৃত্যুর পথ দেখানো নয়—রোগীর পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের কাজ।’’
বিশ্বজুড়ে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্য এবং ইউরোপের নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, পর্তুগালসহ অনেক দেশেই স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ। কোথাও রোগীর স্বেচ্ছায় ওষুধ সেবনই বৈধ, কোথাও চিকিৎসক সরাসরি প্রয়োগ করতে পারেন গুরুতর কষ্টে থাকা রোগীর ক্ষেত্রে।
বর্তমানে ফ্রান্সেও এমন আইন নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। দেশটির জাতীয় পরিষদ একটি বিল পাস করেছে, যেখানে অসহনীয় যন্ত্রণায় ভুগছেন এমন প্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষ শর্তে জীবনের ইতি টানার অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যেও সম্প্রতি সংসদের নিম্নকক্ষ এক বিল অনুমোদন করেছে, যদিও তা এখনো চূড়ান্ত আইন হয়নি।
স্লোভেনিয়ার গণভোট তাই শুধু একটি আইনের ভাগ্য নয়—এটি মানবিক মর্যাদা, যন্ত্রণা, স্বাধীনতা এবং জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে এক গভীর সামাজিক আলোচনার প্রতিফলন। আজকের ভোট সেই আলোচনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।
















