দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপদেশ ফিলিপাইনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিশাল দুর্নীতির ঝড় বইছে, সেই কেলেঙ্কারির প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে সাতজনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিলেন প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, এই গ্রেপ্তাররা হলো সেই বহু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন, যাদের বিরুদ্ধে স্যান্ডিগানবায়ান নামের বিশেষ দুর্নীতি দমন আদালতে মামলা চলছে।
ওই আদালতের নজরে আসা প্রথম প্রকল্পটি হলো ওরিয়েন্টাল মিনদোরোর মাগ-আসাওয়াং তুবিগ নদীর ওপর নির্মাণাধীন বাঁধ। প্রকল্পের মূল্য ছিল ২৮৯ মিলিয়ন পেসো, আর অভিযোগ উঠেছে এটি ছিল ‘ঘোস্ট’ বা অস্তিত্বহীন অবকাঠামো—যার নামে টাকা বেহাত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১১৮.৫ বিলিয়ন পেসো, অর্থাৎ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
দুর্নীতির এই জাল ছিন্ন করতে দুই মাস আগে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন মার্কোস। এরপর রাস্তায় নেমে হাজারো মানুষ দায়ীদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়। মার্কোস জানান, দুইজন আসামি আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিয়েছে, তবে আরও সাতজন এখনো পলাতক। যারা তাদের আশ্রয় দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আসে সাবেক সংসদ সদস্য জ্যালডি কো-র নাম। অভিযোগ উঠেছে, তার পরিবার সানওয়েস্ট কর্পোরেশন নামের সেই নির্মাণ কোম্পানির মালিক, যারা বাঁধ নির্মাণের চুক্তি পেয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনভিক রেমুল্লা জানান, কো দেশ ছেড়ে পালিয়ে থাকতে পারেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও জর্ডানে থাকা তিনজন সন্দেহভাজন শিগগিরই দূতাবাসে আত্মসমর্পণ করতে পারে।
ম্যানিলায় সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কমলা পোশাক পরে তোলা ছবি দেখানো হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম র্যাপলার জানায়, এখন পর্যন্ত গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আটজন কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে—যাদের মধ্যে আছেন দুই আঞ্চলিক পরিচালক, এক প্রকৌশলী এবং বিডিং-কমিটির এক হিসাবরক্ষক।
মার্কোস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তদন্তের পর ধীরে ধীরে আরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি—সিনেটর, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা—অভিযোগ প্রমাণ হলে বড়দিনের আগেই কারাগারে যাবে। কারণ এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে উঠে এসেছে বিলাসবহুল প্রাসাদ, নগদে ভর্তি স্যুটকেস, দামি গাড়ির বহর ও ব্যক্তিগত জেট বিমানের গল্প।
এ কেলেঙ্কারির ঢেউ পৌঁছেছে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রোমান ক্যাথলিক চার্চেও, যারা ৩০ নভেম্বরের বৃহত্তর গণবিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছে।
এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সাবেক প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মার্টিন রোমুয়ালদেজের নামও উঠে এসেছে। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও পদত্যাগ করেছেন। সাবেক সিনেট সভাপতি ফ্রান্সিস এসকুদেরোর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে—তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে, দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি গরিব জনগোষ্ঠীর। ৭,৬৪১ দ্বীপের এই দেশটি ভয়াবহভাবে বন্যাপ্রবণ। সম্প্রতি এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইটি সুপার টাইফুনে প্রায় ২৫০ মানুষ মারা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফিলিপাইনের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ক্রমশ আরও প্রবল ও ঘন ঘন ঝড়-বন্যার মুখোমুখি হচ্ছে—আর সেই বাস্তবতায় দুর্নীতি আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
















