আমেরিকার আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে বেড়ায়, ক্যারিবিয়ান সাগরে জড়ো হয় হাজারো সৈন্য। আর সেই গর্জনের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে ভেনেজুয়েলা—এক দেশ, যে দেশ ফেন্টানিল উৎপাদনই করে না, তবুও ওয়াশিংটনের ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর নামে নতুন এক ঝড়ের মুখোমুখি।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ভেনেজুয়েলা নিয়ে নতুন ধরনের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। চার মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তারা জানায়, প্রথম পদক্ষেপ হবে সিআইএ’র গোপন অপারেশন—যা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যবহারের লক্ষ্যেই সাজানো।
বস্তুত, বিষয়টি আর খুব গোপনও নয়। কারণ এক মাস আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা করেছিলেন—তিনি সিআইএকে ভেনেজুয়েলায় গুপ্তচরবৃত্তি ও অপারেশনের অনুমোদন দিয়েছেন। যেন একটি গোপন অভিযানের কথা সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করাই এখন নতুন নিয়ম।
এরই সঙ্গে সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে “নার্কোটেররিজম” মোকাবিলার নামে। ট্রাম্প একের পর এক সমুদ্রপথে সন্দেহভাজন নৌযান বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন—যা বহু স্থানীয় জেলেকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে, আর আইনগতভাবে তা স্পষ্টই অবৈধ।
মাদকের বিরুদ্ধে এই চিরচেনা যুদ্ধ আসলে আমেরিকার পুরনো অজুহাত। এই স্লোগানকে সামনে রেখে দেশটি দশকের পর দশক লাতিন আমেরিকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে, গরিব জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন করেছে, আর একই সঙ্গে নিজেদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার টাকার স্রোতে ভাসার সুযোগ দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস একসময়ই লিখেছিল, “সিআইএ-র সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক সংস্থাটির জন্মের সমান পুরনো।”
ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধবিরোধী ভঙ্গি দেখালেও তিনি ইরানে বোমাবর্ষণ করেছেন, এখন আবার নতুন এক সংঘাতে দেশকে জড়িয়ে ফেলছেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ওপর আক্রমণের যে অজুহাত—তা ভেঙে পড়ে সহজেই। কারণ যেই ফেন্টানিল সংকটের দায় মাদুরোর ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে, সেই মাদক ভেনেজুয়েলায় উৎপাদনই হয় না। দেশটির অপরাধচক্ররা মূলত ইউরোপে কোকেন পাঠানোর সঙ্গেই জড়িত, যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল নয়—এ তথ্য এনবিসি নিউজসহ বহু মার্কিন মাধ্যমই প্রকাশ করেছে।
কিন্তু বাস্তবতার পরোয়া করে না সামরিক প্রদর্শনী। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিলেন—এই সামরিক প্রস্তুতি নাকি “আমাদের মানুষকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করার মিশন।” অথচ সেই একই প্রশাসন দেশটির গরিব জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। বন্দুক সহিংসতায় যখন শিশুদের জীবন ঝরে যায়, তখন কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় না।
তবু মাদুরোকে দোষারোপ করা সহজ, আর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থে তা উপযোগীও। চাভেজের পর মাদুরোও হয়ে উঠেছেন ওয়াশিংটনের চোখের কাঁটা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণে ভেনেজুয়েলা ইস্যুকে সামনে ঠেলে দিচ্ছেন—বিশেষত ফ্লোরিডার ডানপন্থী ভেনেজুয়েলান ও কিউবান অভিবাসী ভোট ব্যাংকের প্রতি তাকিয়ে।
রয়টার্স জানাচ্ছে, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করাই মার্কিন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। সফল হলে রুবিও যুক্ত হবেন সেই দীর্ঘ তালিকায়—যেখানে নিজেদের রাজনৈতিক লাভের জন্য যেসব মার্কিন নেতা বিদেশের মাটিতে রক্ত ঝরিয়েছেন।
ওদিকে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, হোয়াইট হাউজ এমনকি কারাকাসের আকাশে মার্কিন বিমান দিয়ে ‘মানসিক চাপ সৃষ্টির’ উদ্দেশ্যে প্রচারপত্র ছড়ানোর ধারণাও তুলেছে। যেন পুরনো ইসরায়েলি সামরিক কৌশলে নতুন রং-তুলি দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য-গোপন আগ্রাসন কোনো দেশের জন্যই নিরাপত্তা বয়ে আনবে না। বরং নতুন এক অস্থিরতার ঝড় ডেকে আনবে—যার চূড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব আবারও দেখতে পারে সিআইএ’র আরেকটি ব্যর্থ অভিযানের জন্ম।
















