ব্রাজিলের বেলেম শহরে দুই সপ্তাহের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও টানাপোড়েনের পর শেষ হলো এবারের জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP30। সম্মেলনের চূড়ান্ত চুক্তিতে দেশগুলোর জলবায়ু পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হলেও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণার সময় COP30 সভাপতি আন্দ্রে আরানহা কোরেয়া দো লাগো বলেন, অনেক দেশ আরও শক্তিশালী প্রতিশ্রুতির আশা করেছিল। তিনি জানান, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার ঘোষণার আলোকে বন উজাড় থামানো ও জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে পৃথক রোডম্যাপ তৈরি করা হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে জানান, COP30 কিছু অগ্রগতি এনেছে—বিশেষত জলবায়ু অভিযোজন তহবিল তিনগুণ বাড়ানোর আহ্বান এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা পার হওয়ার আশঙ্কা স্বীকার করা। তবে তিনি বলেন, “বিজ্ঞান যেটা দাবি করছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার ফাঁক এখনো বিপজ্জনকভাবে বড়।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু কমিশনার ভপকে হোকস্ট্রা বলেন, তারা আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপ চান। “চুক্তিটি নিখুঁত নয়, তবে এটি সঠিক দিকের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
কোলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো তীব্র সমালোচনা করে বলেন, COP30 ঘোষণায় জীবাশ্ম জ্বালানিকে জলবায়ু সংকটের মূল কারণ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করলে “সবকিছুই ভণ্ডামি” হবে।
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস পারিলা বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় ফল কম হলেও বেলেম সম্মেলন বহুপাক্ষিকতার গুরুত্ব দেখিয়েছে। তিনি উন্নত দেশগুলোর অভিযোজন তহবিল তিনগুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন।
চীনের প্রতিনিধি লি গাও ফলাফলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে যে সমঝোতা হয়েছে তা বৈশ্বিক সংহতির প্রমাণ।
ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট (AOSIS) চুক্তিটিকে “অসম্পূর্ণ হলেও অগ্রগতির পথ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, বহুপাক্ষিক আলোচনার স্বরূপই হলো মতভিন্নতা ও সমঝোতার প্রক্রিয়া।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জলবায়ু ন্যায়বিচার পরামর্শক অ্যানে হ্যারিসন বলেন, যদিও ব্রাজিল অংশগ্রহণ বিস্তৃত করতে চেষ্টা করেছে, তবুও বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজকে দূরে রাখা হয়েছে। তবে তিনি ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ কাঠামো গঠনের প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখেন।
অক্সফাম ব্রাজিলের নির্বাহী পরিচালক ভিভিয়ানা সান্তিয়াগো বলেন, COP30 কিছু আশার সঞ্চার করেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে হতাশাই বেশি। তার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে ধনী দেশগুলোরই আগে এগিয়ে এসে তহবিল বাড়ানো উচিত, নাহলে বহু দেশে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর থমকে যাবে।
সামগ্রিকভাবে COP30 জলবায়ু চুক্তি ভবিষ্যতে জলবায়ু পদক্ষেপে অগ্রগতি আনবে বলে আশা করা হলেও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্যাশার তুলনায় তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
















