চীন এবং জাপানের বহুদিনের টানাপোড়েন হঠাৎই নতুন ঝড় তোলে, যখন জাপানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সানাএ তাকাইচির তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্য বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই দু দেশের সম্পর্ক যে আবার গভীর অন্ধকারে ডুবছে, তা এখন স্পষ্ট। নভেম্বর জুড়ে কূটনৈতিক বিরোধ জ্বলে উঠেছে, আর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তার বড় বড় অঙ্গনে।
চীন জানায় জাতিসংঘকে, যদি জাপান কখনও তাইওয়ান প্রণালীর উত্তেজনায় সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে সেটি আক্রমণের নামান্তর হবে। বেইজিং বহুদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে দাবি করে, এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও অস্বীকার করেনি। চীনের জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং এর কঠোর ভাষা দুই দেশের বরফঠান্ডা সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এই দ্বন্দ্বের শুরু নভেম্বরের প্রথম দিকে, যখন তাকাইচি পার্লামেন্টে বলেন, তাইওয়ানে চীনা নৌবাহিনীর অবরোধ কিংবা সামরিক তৎপরতা জাপানকে প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য করতে পারে। জাপানের পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রীদের চেয়ে এই ভাষা অনেক বেশি সরাসরি, অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। চীন সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানায়, ফেরত নিতে বলে মন্তব্যটি। কিন্তু তাকাইচি তা করতে অস্বীকৃতি জানান।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। চীনের ওসাকা কনসালের এক বিতর্কিত পোস্ট, যেখানে তিনি হুমকির সুরে কথা বলেন, জাপানের জনমনে ক্ষোভ বাড়ায়। দুই দেশ একে অন্যের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানায়, কথার লড়াই বাড়তে থাকে। কিন্তু উত্তেজনা থামার বদলে নতুন দিকে মোড় নেয়।
এবার সামনে আসে বাণিজ্য যুদ্ধ। নভেম্বরের মাঝামাঝি চীন জাপানের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে, বিমান সংস্থাগুলো টিকিট ফেরত বা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা দেয় বেইজিং। দুই দেশের নাগরিকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়, যদিও এগুলো পরস্পর-সম্পর্কিত কিনা এখনো পরিষ্কার নয়।
এর পাশাপাশি পূর্ব চীন সাগরের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে পুরনো বিরোধও আবার মাথা তোলে। সেনকাকু বা দিয়াওইউ দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনা উপকূলরক্ষী বাহিনীর টহল এবং জাপানি জলে সংক্ষিপ্ত অনুপ্রবেশ নতুন করে উত্তাপ ছড়ায়। টোকিও অভিযোগ তোলে, বেইজিং নিজের ক্ষমতা দেখাতে চায়।
চীন এবার সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের দিকেও কঠোরতা দেখায়। বেশ কয়েকটি জাপানি ছবি প্রদর্শন স্থগিত করা হয়, জাপানি সামুদ্রিক খাবার আমদানি বন্ধ করে দেয় বেইজিং। এমনকি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রীদের নির্ধারিত বৈঠকও চীন পিছিয়ে দেয়।
বেইজিংয়ে দু দেশের কূটনীতিকদের বৈঠকেও উত্তেজনা কাটেনি। চীনা প্রতিনিধি লিউ জিনসঙ এমন পোশাক পরেন, যা ইতিহাসে জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের প্রতীক। তার হাত পকেটে রেখে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি জাপানিদের কাছে অসম্মানজনক বলেই মনে হয়। এই বৈঠকও শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়।
দীর্ঘ ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন আজও জীবন্ত। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ, উপনিবেশ, দখলদারিত্ব—সবই চীনের স্মৃতিতে দগদগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পর্ক বদলালেও সন্দেহ আর সংশয়ের দেয়াল কখনো ভাঙেনি।
কিন্তু আজকের বাস্তবে বাণিজ্যই দু দেশের সবচেয়ে বড় যোগসূত্র। চীন জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, আর জাপান চীনের তৃতীয় বৃহত্তম। ২০২৪ সালে দুই দেশের পণ্যের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল শত শত বিলিয়ন ডলার। সামুদ্রিক খাবার, যন্ত্রপাতি, সেমিকন্ডাক্টর—সব ক্ষেত্রেই পরস্পর নির্ভরশীলতা প্রবল।
২০১০ সালে জাপানের কাছে বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ এবং ২০২৩ সালে ফুকুশিমা ইস্যুতে খাদ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ ইতিহাসে রয়েছে। আর এবার তাকাইচির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের ওপর আবার চাপ নেমে এসেছে।
দুই দেশ যেন দাঁড়িয়ে আছে পুরনো ক্ষোভ আর নতুন উত্তেজনার সংযোগস্থলে। এশিয়ার দুই শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্ক এখন তীক্ষ্ণ ছুরির ধার। তাইওয়ান প্রণালীর বাতাসে কূটনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সবকিছুই ভাসছে, আর প্রতিটি সন্ধ্যা যেন নতুন অনিশ্চয়তার আলো আঁধারি নিয়ে আসে।
উভয় দেশই কড়া ভাষায় একে অন্যকে সতর্ক করছে, কিন্তু কেউই পিছু হটছে না। এই দ্বন্দ্ব কত দূর যাবে, এবং কোন বিন্দুতে থামবে—তা সময়ই বলে দেবে; তবে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবনে, ব্যবসার বাজারে, এবং এই অঞ্চলের নরম, অস্থির ভূরাজনীতিতে।
















