বৈশ্বিক শিক্ষা মানচিত্রে চীনের এক চমকপ্রদ উত্থান
১.৪১ বিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ চীন এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তিই নয়, বরং বিশ্বের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃহত্তম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এটিকে একটি বিশ্ব শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেছে। সাংহাই, বেইজিং, শেনজেন, এবং গুয়াংঝৌর মতো মহানগরীগুলো এখন শুধু অর্থ ও প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু নয়, এগুলো উচ্চশিক্ষা ও উদ্ভাবনেরও প্রধান কেন্দ্র। এসব শহর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষা এবং উজ্জ্বল কর্মজীবনের হাতছানি দিচ্ছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের আকর্ষণ
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে চীনমুখী আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই প্রবণতার মূলে রয়েছে দু’দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত সহযোগিতা। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী: বর্তমানে প্রায় ১২,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনে অধ্যয়নরত, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। এই উপস্থিতি শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি জ্ঞান স্থানান্তর এবং দু’দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধনকেও সুদৃঢ় করছে।
- ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI): এই উদ্যোগের মাধ্যমে চীন বাংলাদেশকে বৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার তরুণ বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
- বিশ্ব র্যাংকিংয়ে শ্রেষ্ঠত্ব: টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৫-এ চীন শীর্ষ ১০টির মধ্যে পাঁচটি স্থান নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি এবং পিকিং ইউনিভার্সিটি এশিয়ার শীর্ষ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়েও শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছয়টি চীনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিক্ষার মান ও বৃত্তি সুবিধা
চীনকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মূল গন্তব্য করে তোলার পেছনে রয়েছে এর শিক্ষার গুণগত মান এবং সহজলভ্যতা।
- সেরা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ: পিকিং ইউনিভার্সিটি, সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি, ফুদান ইউনিভার্সিটি, সাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি, এবং ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি সহ শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইংরেজি-মাধ্যম প্রোগ্রাম অফার করছে, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য মানিয়ে নেওয়া সহজ করে তোলে।
- জনপ্রিয় পাঠ্যক্রম: বেশিরভাগ শিক্ষার্থী স্নাতক স্তরের প্রোগ্রামগুলিতে ভর্তি হচ্ছে, বিশেষত চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্য প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং উদীয়মান ক্ষেত্র যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য শক্তি। স্নাতকোত্তর এবং ডক্টরাল স্তরেও জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়োটেকনোলজির মতো উন্নত বিষয়ে গবেষণা চলছে।
- ‘চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ’ (CGS): এই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তিটি টিউশন ফি, বাসস্থান, মাসিক ভাতা, স্বাস্থ্য বীমা এবং ভ্রমণ খরচ সম্পূর্ণরূপে কভার করে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৫৫ জন বাংলাদেশি এই বৃত্তি পেলেও, ২০২৫-২৬-এর জন্য এই সংখ্যা বেড়ে ৮০ হয়েছে। এছাড়াও, প্রাদেশিক ও পৌরসভা বৃত্তি, সিল্ক রোড স্কলারশিপসহ আরও অনেক সুযোগ রয়েছে।
স্নাতকদের জন্য কর্মজীবনের সুবর্ণ সুযোগ
চীন থেকে শিক্ষিত বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েটদের কর্মজীবনের দিগন্ত অত্যন্ত উজ্জ্বল।
- প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা: তারা দেশে ফিরে শুধু বিশেষজ্ঞ হিসেবে নয়, বরং চীনকে বুঝতে পারা পেশাদার হিসেবে এক স্বতন্ত্র সুবিধা লাভ করেন।
- কর্পোরেট ভূমিকা: বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রধান অবকাঠামো বিনিয়োগকারী হিসেবে, চীন এমন বিশেষজ্ঞদের জন্য চাহিদা তৈরি করেছে যারা সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ব্যবধান পূরণ করতে পারে। গ্র্যাজুয়েটরা প্রায়শই **হুয়াওয়ে, জেডটিই, চায়না পাওয়ার, এবং সিআরসিসি-**এর মতো চীনা সংস্থাগুলোর স্থানীয় অফিসগুলোতে বা পদ্মা সেতু রেল সংযোগের মতো মেগা-প্রকল্প পরিচালনার স্থানীয় দলগুলোতে কাজ পান।
- উদ্যোক্তা হিসেবে উত্থান: অনেকে বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, কনসালটেন্সি ফার্ম বা প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছেন এবং সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
চীনে বিনিয়োগকৃত শিক্ষা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল একটি ডিগ্রি নয়, বরং তা ভাষা দক্ষতা, পেশাদার নেটওয়ার্ক এবং সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া নিয়ে আসে। এই শিক্ষার্থীরাই বাংলাদেশ-চীন জনগণের বন্ধনকে শক্তিশালী করার এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে ২১ শতকের ভূ-রাজনীতিতে বিচরণের জন্য প্রস্তুত নতুন প্রজন্মের নেতা।

লেখক: মোহাম্মদ সাইয়েদুল ইসলাম চীনের সানমিং ইউনিভার্সিটি, স্কুল অফ ওভারসিজ এডুকেশন (স্কুল অফ ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস)-এর সিনিয়র লেকচারার ও গবেষক।















