একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে জোরালো সমর্থকদের একজন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসওমেন মার্জরি টেলর গ্রিন। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট স্বপ্নকে নিজের কণ্ঠে বহন করে চলেছেন বহু বছর। কিন্তু সেই সম্পর্কের সোনালি সেতুতে এখন ফেটে গেছে তীব্র বিরোধের শিলাখণ্ড। প্রকাশ্যে, হঠাৎই, ডুবে গেছে এক গভীর বিবাদের অন্ধকারে।
গ্রিন সম্প্রতি ট্রাম্পের নীতি সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনায় পরিণত হয়েছেন আরও দৃঢ়, বিশেষ করে বিদেশ নীতিতে। ইসরাইলের গাজার গণহত্যা বলে পরিচিত যুদ্ধকে তিনি করুণ সত্যের মতো তুলে ধরেছেন, আর দেশে বেড়ে চলা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ছুঁড়েছেন তীক্ষ্ণ অভিযোগ। তার দাবি, ট্রাম্পের চোখে বিদেশের যুদ্ধই বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ আমেরিকার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সংগ্রাম করছে টিকে থাকার জন্য।
কিন্তু ভাঙনের আসল ধাক্কা আসে যখন গ্রিন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এক হয়ে জেফ্রি এপস্টাইনের গোপন নথি প্রকাশের পক্ষে ভোট দেন। অতীতের এক বন্ধুত্ব, ট্রাম্প আর এপস্টাইনের যৌথ ইতিহাস, আবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ক্ষোভ উগরে দিয়ে গ্রিনকে আখ্যা দেন অদ্ভুত, পাগলাটে ও পুরোপুরি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। endorsement প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে সময় নেননি তিনি। পরদিনই, আরও কঠোর ভাষায় তাকে বলেন রিপাবলিকান দলের অপমান।
গ্রিন পাল্টা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প তার জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন করছেন। ট্রাম্পের অনলাইন আক্রমণের পরে তার বিরুদ্ধে হুমকির বার্তা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
কিন্তু মার্জরি টেলর গ্রিন আসলে কে, আর কেনই বা তিনি হঠাৎ ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করলেন?
গ্রিনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালে, যখন তিনি দূরডানপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। ২০২০ সালে জর্জিয়ার ১৪ নম্বর জেলার প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার সময়ও তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন, এমনকি পরবর্তীতে বলেন, এটি ছিল কেবলই এক বিদ্রোহের মুহূর্ত tyrant বিরোধী আন্দোলন।
রক্ষণশীল মূল্যবোধকে ধ্রুবতারা ভেবে এগিয়েছেন সবসময়। অস্ত্র আইনের পক্ষে, গর্ভপাতের বিপক্ষে, অভিবাসন কঠোরতার প্রতি দৃঢ় সমর্থন—এসব পরিচয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক আলাদা অবস্থান। আর তার ব্যক্তিগত ইতিহাস, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক কোম্পানির দায়িত্ব থেকে ক্রসফিট জিম চালানো—সবই তাকে তৈরি করেছে এক বিতর্ক তোলা ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গ্রিন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলছেন—এপস্টাইন ফাইল থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, এবং ওয়াশিংটনের বিদেশমুখী নীতি ব্যবস্থাপনা। তিনি বলছেন, সাধারণ আমেরিকানদের কণ্ঠকে ট্রাম্প শুনছেন না।
ট্রাম্প পাল্টা বলছেন, গ্রিন নাকি শুধু অভিযোগ করেন। তিনি আর তার ফোন ধরেন না, কারণ প্রতিদিনের উন্মত্ত কথাবার্তা নাকি তিনি সহ্য করতে পারেন না।
তবে গ্রিনের বক্তব্য আরও মর্মান্তিক। তিনি বলেন, তিনি ট্রাম্পকে মানুষ হিসেবে পূজা করেন না; তিনি ঈশ্বরের উপাসক, আর জনগণের জন্যই কাজ করেন। তার দাবি, তিনি বছরের পর বছর নিজের শ্রম, সময়, অর্থ ব্যয় করেছেন ট্রাম্পকে এগিয়ে রাখতে, অথচ দেশবাসী আজও নিজের ঘরের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এই তীব্র সংঘাতের মধ্যে MAGA সমর্থকদের অনেকে গ্রিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কেউ কেউ আবার ট্রাম্পকে প্রশ্ন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসময়ের বিশ্বস্ত ভোটাররাও হতাশা জানাচ্ছেন, বলছেন—ট্রাম্প পথ হারিয়েছেন।
গ্রিনকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। সাংবাদিককে গালাগাল করা থেকে শুরু করে মুসলিমবিরোধী মন্তব্য, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য, ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতপূর্ণ অভিযোগ—সবই তার অতীতের ভারী তালিকায় রয়েছে। ২০২১ সালে তার আগের উগ্র মন্তব্যের কারণে হাউসের কমিটি দায়িত্ব থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আজ, ট্রাম্প এবং গ্রিনের সম্পর্কের ভাঙন কেবল দুই ব্যক্তির বিরোধ নয়। এটি হয়েছে রিপাবলিকান রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ঝড়ের প্রতিধ্বনি—এক ঝড় যা MAGA ঘরানার অভ্যন্তরেই তোলপাড় করছে অস্থিরতার ঢেউ।
এই লড়াই কোথায় গিয়ে থামবে, আর এর প্রভাব কতদূর পৌঁছাবে, তা এখনো অজানা—কিন্তু আমেরিকার রাজনৈতিক আকাশে যে ঝড় জমেছে, তার গর্জন এখনই শোনা যাচ্ছে।
















