সোমালিয়ার আকাশে নেমে এসেছে এক অদৃশ্য ঝড়। সরকারি ইমিগ্রেশন ও সিটিজেনশিপ সংস্থা নিশ্চিত করেছে, দেশের বহুল প্রচারিত ই ভিসা ব্যবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয়ের হ্যাকাররা বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে সেই সব মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, যারা এই ডিজিটাল পথ ধরে সোমালিয়ায় প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন।
রবিবার সরকারের এই স্বীকারোক্তি আসে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আগাম সতর্কবার্তার পর। মার্কিন দূতাবাস অনুযায়ী, অন্তত পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষের সংবেদনশীল তথ্য হ্যাকারদের হাতে পৌঁছে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছেন বহু আমেরিকান নাগরিকও।
কয়েকদিন আগেও সোমালিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আহমেদ মোলিম ফিকি ই ভিসাকে নিরাপত্তা সুরক্ষার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই ব্যবস্থাই নাকি আইএসআইএল যোদ্ধাদের দেশটিতে ঢোকার পথ রুদ্ধ করতে সাহায্য করেছে। অথচ ঠিক সেই সময়েই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল এক ভয়ংকর ভাঙন।
বিগত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিগত তথ্যের স্ক্রিনশট এই ঘটনার খবরকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। সরকারের প্রচারিত নিরাপদ ডিজিটাল সিস্টেম যে কতটা ভঙ্গুর, তা মুহূর্তেই সামনে চলে আসে।
ইমিগ্রেশন সংস্থা জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। কতটা ক্ষতি হয়েছে, কোথা থেকে আক্রমণ এসেছে, এবং এর প্রকৃত ব্যাপ্তি কী—সবকিছু খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরাসরি জানানো হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে কতজন আক্রান্ত, তা এখনো অস্পষ্ট। তদন্ত শেষ হতে কত সময় লাগবে সেটিও অজানা।
এই সতর্কতার মাঝেই সরকার নীরবে ই ভিসা প্ল্যাটফর্মকে নতুন ওয়েবসাইটে সরিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের দূতাবাস সতর্কতা দিয়ে বলেছে, এই ফাঁস এখনো চলমান, এবং যেকোনো নতুন তথ্য প্রদানকারীর ডেটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নাগরিকদের তাই আবেদন করার আগে ঝুঁকি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সোমালিয়ার সাবেক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহিম মনে করেন, হ্যাকিং যতটা বড় সমস্যা, এর চেয়েও বড় হল সরকারের নীরবতা। তার প্রশ্ন—ওয়েবসাইটের ঠিকানা বদলানো হলো কেন? কেন জনগণকে আগে জানানো হয়নি?
এদিকে, শনিবার রাতে ইমিগ্রেশন দপ্তরের মহাপরিচালক এক অনুষ্ঠানে এই ফাঁসসংক্রান্ত সংবাদগুলোকে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত হিসেবে আখ্যা দিলেও হ্যাকিংয়ের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি।
ঘটনাটি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বিচ্ছিন্নপ্রবণ অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে। ১৯৯১ সাল থেকে যে অঞ্চল নিজস্ব স্বাধীনতা দাবি করে আসছে, সেখানে কর্মকর্তারা অভিযোগ তুলেছেন—মোগাদিশুর প্রশাসন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে, এমনকি ফাঁসের পরও ই ভিসা প্ল্যাটফর্ম চালু রেখেছে।
এ মুহূর্তে সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকার যখন জাতীয় আকাশসীমা ও ভিসা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে, তখনই ডেটা ফাঁস পুরো পরিস্থিতিকে আরও গোলমেলে করে তুলেছে। ঘটনার মাত্র একদিন আগে সোমালিল্যান্ড ঘোষণা করেছিল—সোমালিয়া সরকারের দেওয়া কোনো প্রবেশ ভিসার তাদের ভূখণ্ডে কোনো আইনগত মূল্য নেই।
সোমালিয়ার ডিজিটাল নিরাপত্তার উপর এত বড় আঘাত—যেন দেশের আকাশে ছড়িয়ে পড়া অনিশ্চয়তার ধোঁয়া। আর সেই ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে হাজারো যাত্রী ভাবছেন—তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কি আর কখনো নিরাপদ থাকবে?
















