দক্ষিণ এশিয়ায় জেনারেশন জেড বিপ্লব: কাঠমান্ডু, ঢাকা ও কলম্বোতে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতন ।
কাঠমান্ডু/ঢাকা/কলম্বো: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে—নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা—তরুণ নেতৃত্বে বিক্ষোভ আন্দোলন সরকার পতনের দিকে নিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহ আঞ্চলিক রাজনীতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে এবং দক্ষিণ এশিয়াকে জেনারেশন জেড বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এর গভীরে ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির মতো দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। কয়েকদিনের সংঘর্ষে ৭০ জনেরও বেশি নিহত হয় এবং সংসদ দখলের পর পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সরকারি চাকরির কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হলেও পুলিশি দমনপীড়নে তা রূপ নেয় জাতীয় আন্দোলনে। শত শত প্রাণহানি ঘটার পর আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগে গড়ায়। তিনি শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জন্ম নেয় ‘আরাগালায়া’ বা ‘সংগ্রাম’ আন্দোলন। ঋণ খেলাপি, জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্য ঘাটতির মধ্যে বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির বাড়ি দখল করে; দেশ ছাড়েন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি এক—একটি তরুণ প্রজন্ম, যারা ডিজিটাল মাধ্যমে সংযুক্ত, উচ্চশিক্ষিত হলেও সীমিত কর্মসংস্থানের মুখোমুখি। তাদের অসন্তোষ মূলত দুর্নীতি, বৈষম্য ও অকার্যকর শাসনের বিরুদ্ধে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “জেনারেশন জেড মহামারি ও মন্দার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। অথচ তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রবীণ ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতিবিদরা। এই বৈপরীত্যই তাদের ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিয়েছে।”
জনমিতি (demographics) এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ২৮ বছরের নিচে। তুলনামূলক উচ্চ সাক্ষরতার হার থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। আন্দোলনের স্লোগান তাই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, বরং ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সুযোগ—যা সমাজজুড়ে সাড়া ফেলেছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও এই আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার। হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে ডিসকর্ডে অনলাইন ভোটের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব বাছাই—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি তরুণদের সংগঠিত করেছে।
গবেষকরা মনে করছেন, এই তরুণ বিদ্রোহ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন ধারা আনছে। এটি সামরিক অভ্যুত্থান বা দলীয় সংঘাতের মতো নয়; বরং প্রজন্মভিত্তিক এক নতুন ধরনের গণআন্দোলন।
















